ভাবনার যত কেলেঙ্কারি

শোবিজ প্রতিবেদক

অভিনয় শিল্পী আশনা হাবিব ভাবনা। অভিনেত্রী হিসেবে নিজের নাম জাহির করলেও এখনো ভালো কোনো কাজ দিয়ে আলোচনায় আসতে পারেননি। বরং নানা কারণে তিনি সমালোচনার তিরে বিদ্ধ হচ্ছেন অনবরত। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কতিপয় শিল্পীর গঠিত ‘আলো আসবেই’ গ্রুপে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ এখনো ভোলেনি এ দেশের মানুষ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ভাবনা জনগণের তোপের মুখেও পড়েছিলেন। সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত এবং সংসদ সদস্য ফেরদৌসের নেতৃত্বে সবাইকে এই গ্রুপে অ্যাড করা হয়, যারা মূলত আওয়ামী লীগ সমর্থক। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘আলো আসবেই’ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়। যেখানে আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে পরিচিত অভিনয় শিল্পীদের একটি দল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে দমানোর জন্য নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন। এদিকে সেই গ্রুপে যুক্ত থাকার পরও দুই নৌকায় পা দিয়ে চলেন আশনা হাবিব ভাবনা। ছাত্র আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদকে নিয়ে ছবি এঁকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে মায়াকান্নার অভিনয় করেন এবং ‘আলো আসবেই’ গ্রুপে যুক্ত ছিলেন বলে এমন দাবি তুলেছেন নেটিজেনরা। অভিনেত্রীভাবনার ফেসবুক প্রোফাইলে ছবি শেয়ারের বিষয়টি দেখা গেছে এবং গ্রুপে যুক্ত থাকার সত্যতা মিলেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুয়াদ স্বনাম নামে একজন লিখেছেন, ‘আরাফাত হাসানের বেড নায়িকা ভাবনার দুঃসাহস দেখে রাগে ফেটে পড়ছি এ মুহূর্তে। কত্ত বড় বিচ সে যে আমাদের আদর্শ আমাদের শহীদ আবু সাঈদকে নিয়ে কাকতাড়ুয়ার কার্টুন বানায়। চলুন এর বাসা ঘেরাও করে রাস্তায় জনসম্মুখে কান ধরে উঠবস করানো দরকার নারী নামের কলঙ্ক এই বিচ ভাবনাকে।’ উলিউল্লাহ নামে আরেকজন তার আইডিতে লিখেছেন, ‘কী পরিমাণ মস্তিষ্ক বিকৃত- ভাবা যায়! ‘আলো আসবেই’ নামক সিক্রেট হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলার পর নাটকের অভিনেত্রী আশনা হাবিব ভাবনা ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রথম শহীদ রংপুরের ‘আবু সাঈদ’ এর ব্যঙ্গচিত্র এঁকে তার মধ্যে কাকের ছবি বসিয়ে সেটিকে শেয়ার করেন মজা নেওয়ার জন্য। কী বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ চিন্তা করা যায়।’ জান্নাতুন নাঈম প্রীতির ভাষ্য, ‘সবচেয়ে বড় রসিকতাটা সম্ভবত করেছেন আশনা হাবিব ভাবনা। ইনি ছাত্র আন্দোলনের আবু সাঈদকে নিয়ে ছবি এঁকে নাকি কান্নার অভিনয় করে এই গ্রুপে দিব্যি বসেছিলেন। শিল্পী মানেই বিবেকবোধ ঠিক থাকবে, এই ধারণা থেকে বেরয়ে আসার ক্ষেত্রে- এদের ধন্যবাদ। শিল্পের নামে মানুষ হত্যা, সাধারণ ছাত্রদের সন্ত্রাসী ট্যাগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন কোন শিল্পী ভূমিকা রেখেছে সেটা আমাদের জানা থাকল। যেসব ছাত্র পা হারিয়েছেন, বুকে আর মাথায় গুলি খেয়েছেন- তারাও জেনে রাখুন সব শিল্পীরই বিবেকবোধ নাই এবং সব বিবেকবোধওয়ালা মানুষ শিল্পী হওয়ার আগে- মানুষ।’

সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে ভাবনার সব কীর্তিকলাপই জন্ম দিচ্ছে নানা আলোচনার। হাতে কোনো সিনেমা নেই। করছেন না টিভি নাটকও। অথচ প্রায়ই বিশ্বের নানা প্রান্তের পাঁচ তারকা হোটেলে দেখা যায় ভাবনাকে। নেটিজেনদের প্রশ্ন সি গ্রেডের নায়িকা হওয়া সত্ত্বেও ভাবনার এমন বিলাসবহুল জীবন কাটানোর টাকার উৎস কী?

অভিনেত্রীএদিকে বিতর্কিত নায়িকা ভাবনার খোলামেলা পোশাক শুধু দেশে নয়, বিদেশের মাটিতেও এ দেশের সংস্কৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এতে খোদ শোবিজ অঙ্গনের সিনিয়র শিল্পীরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন তার প্রতি। অথচ এতেও তার শুভবুদ্ধির উদয় হয়নি। বরং সমালোচনাকারীদের প্রতি তিনি তার ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বলেছেন, ‘যারা মন্তব্য করে তাদের কথায় আমি কান দিই না। আমি জানি আমি কী করছি, কেন করছি। আর এটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’

সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে ২০২৪ সালের ১২ মে বৈশ্বিক চলচ্চিত্রের সম্মানজনক আসর কান চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যান ভাবনা। সেখানে তিনি রেড কার্পেটে খোলামেলা আবেদনময়ী পোশাকে হেঁটে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেন এবং দেশের সিনিয়র শিল্পীদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করেন। তার এমন দেশীয় সংস্কৃতিবর্জিত পোশাককাণ্ডে তখন অনেকের মধ্যে কড়া সমালোচনায় সোচ্চার হয়েছিলেন প্রয়াত অভিনেত্রী অঞ্জনা রহমান। তিনি ফেসবুকে মন্তব্য করে বলেছিলেন, এসব নায়িকা বাঙালি সংস্কৃতি নষ্ট করছে। অঞ্জনা তাঁর পোস্টে লিখেছিলেন : ‘কান ফেস্টিভ্যালে নিজেকে অত্যাধুনিকভাবে প্রেজেন্ট করতে গিয়ে এ দেশের নামধারী নায়িকা এমন পোশাকে জনসম্মুখে আবির্ভূত হয়েছেন, যেটা কখনো একজন পরিপূর্ণ বাঙালি শিল্পী, যার মধ্যে বিন্দু পরিমাণ শিল্পসত্তা বিদ্যমান তিনি এমন খোলামেলা পোশাকে নিজেকে এবং নিজের দেশীয় সংস্কৃতিকে অপমান করতে পারেন না।’ তিনি আরও লিখেন, ‘খোলামেলা পোশাক কখনোই বাঙালি সংস্কৃতির বাহক নয়, বাঙালি সংস্কৃতি কৃষ্টির প্রতি যার কোনো মমত্ববোধ না থাকে সে আবার কীসের শিল্পী?’

এর আগেও ভাবনা তার খোলামেলা পোশাক নিয়ে একাধিকবার সমালোচনার জন্ম দেন। যেমন ২০১৯ সালের এপ্রিলে ঈদ নাটকের শুটিংয়ে গিয়েছিলেন কক্সবাজারে। সেখান থেকে ঢাকায় ফিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কক্সবাজারে তার তোলা খোলামেলা ছবি প্রায় প্রতিদিন শেয়ার করে বলেন, ‘আমি কক্সবাজার ভয়াবহ মিস করছি, তাই একের পর এক ছবি।’ এই ট্যুরে তার সঙ্গে ছিলেন কথিত বয়ফ্রেন্ড নির্মাতা অনিমেষ আইচ। এই নির্মাতাকে জড়িয়েও নানা মুখরোচক গল্পের অন্ত ছিল না ভাবনার। ভাবনা আবেদনময়ী পোশাকে নিজেকে বারবার উদার বলে দাবি করলেও ববিতার মতো একজন কিংবদন্তি অভিনেত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এ ধরনের শিল্পী নামধারীদের দেশের সংস্কৃতিবিবর্জিত কর্মকাণ্ডের কারণেই আজ অভিনয়ে ফিরতে বা নিজেকে বাংলাদেশের অভিনেত্রী পরিচয় দিতে কুণ্ঠাবোধ করতে হয়। বেশ কয়েক বছর ধরে দেখছি, চলচ্চিত্র বা বিদেশের কোনো মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবে এ দেশের কথিত কতিপয় শিল্পী যেভাবে খোলামেলা হয়ে নিজেদের উপস্থাপন করেন তা বাঙালি জাতি হিসেবে সত্যিই আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জার। অথচ একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশি শিল্পীদের বিদেশে মর্যাদার সঙ্গে দেখা হতো। বর্তমানের কিছু নামধারী শিল্পীর এমন অধঃপতন আমার চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights