মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির জন্য কেন রাশিয়া জরুরি?
অনলাইন ডেস্ক
বিগত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত। তবে সম্প্রতি ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সেন্ট পিটার্সবার্গ সফর এবং প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার বৈঠক এই সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তেহরান এখন স্পষ্টভাবেই মস্কোর দিকে তাকিয়ে আছে, কারণ তারা মনে করছে বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল রাশিয়ার পক্ষেই সম্ভব ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ থেকে ইরানকে সুরক্ষা প্রদান করা। ২৮ এপ্রিল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ মুরাদ সাদিগজাদে এই কূটনৈতিক সমীকরণটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছেন।
বর্তমানে ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার যুদ্ধ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে কোনো পক্ষই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল সামরিক চাপ প্রয়োগ করে তারা ইরানকে নতজানু করতে পারবে, কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ইরান কোনোভাবেই আত্মসমর্পণের পথে হাঁটেনি বরং দেশটির কূটনৈতিক তৎপরতা আগের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়াশিংটন যেখানে আলোচনার টেবিলে শুরুতেই পরমাণু ইস্যু নিয়ে আসতে চাইছে, তেহরান সেখানে সবার আগে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে অনড় অবস্থান গ্রহণ করেছে।
ইরানের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নতুন প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। এই প্রস্তাবে তেহরান শর্ত দিয়েছে, পরমাণু ইস্যুতে আলোচনার আগে অবশ্যই চলমান যুদ্ধ ও শত্রুতার অবসান ঘটাতে হবে এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে নিশ্চয়তা দিতে হবে। ইরান চায় এমন একটি গ্যারান্টি যাতে ভবিষ্যতে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই তাদের ওপর পুনরায় আক্রমণ করতে না পারে। এই প্রস্তাব ওয়াশিংটনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ ইরানের এই শর্ত মেনে নেওয়ার অর্থ হলো পরোক্ষভাবে এটা স্বীকার করে নেওয়া যে তাদের সামরিক চাপ কোনো কাজে আসেনি।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও এখন বেশ নাজুক। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একদিকে যেমন দেশের ভেতরে রাজনৈতিক চাপের মুখে আছেন, অন্যদিকে লেবানন ও ইরান ফ্রন্টে একযোগে লড়াই চালিয়ে যেতে তার সামরিক বাহিনী হিমশিম খাচ্ছে। ইসরায়েল চাইছে গাজায় সাময়িক যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে কিন্তু তেহরান একে স্রেফ একটি ফাঁদ হিসেবে দেখছে। ইরানের মতে, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিকে কোনো স্থায়ী সমাধান হিসেবে নয় বরং পরবর্তী হামলার জন্য সময় নেওয়ার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে আরও হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার যে আশঙ্কা ছিল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচির সাম্প্রতিক পাকিস্তান, ওমান এবং রাশিয়া সফর তা ভুল প্রমাণ করেছে। পাকিস্তান ও ওমান দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে কিন্তু বর্তমান সংকট এতোটাই গভীর যে কোনো পক্ষই একে অপরের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। এই আস্থার সংকট দূর করতেই ইরান এখন রাশিয়ার সক্রিয় অংশগ্রহণ দাবি করছে। মস্কো কেবল তেহরানের মিত্রই নয়, বরং ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও তাদের শক্তিশালী যোগাযোগ রয়েছে, যা তাদের এক অনন্য অবস্থানে নিয়ে গেছে।
সেন্ট পিটার্সবার্গে আরাঘচির সঙ্গে বৈঠকে পুতিন স্পষ্ট করে বলেছেন, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি পুনরুদ্ধারে যা কিছু প্রয়োজন তা করতে প্রস্তুত। রাশিয়ার এই অবস্থান ইরানের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করছে। মস্কো মনে করে না যে ইরানকে স্রেফ চাপের মুখে রেখে কোনো সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব। রাশিয়ার মধ্যস্থতা কেবল ইরানের স্বার্থ রক্ষা নয় বরং পুরো অঞ্চলকে একটি বৃহত্তর ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ থেকে বাঁচানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাশিয়ার এই সমর্থন ইরানকে আলোচনার টেবিলে বাড়তি শক্তি যোগাচ্ছে যাতে তারা একতরফা কোনো আলটিমেটাম মেনে নিতে বাধ্য না হয়।
কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি এই সফরের একটি সামরিক কৌশলগত দিকও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অবস্থায় যদি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবারও ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক হামলা চালাতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তেহরান ও মস্কোর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সামরিক-প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হওয়াটাই স্বাভাবিক। রাশিয়া বিশ্বাস করে, কূটনৈতিক সাফল্যের জন্য আত্মরক্ষার সক্ষমতা থাকা জরুরি। একটি রাষ্ট্র যদি সামরিকভাবে শক্তিশালী থাকে তবেই সে আলোচনার টেবিলে একটি সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছাতে পারে।
সামনের দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য কোন দিকে যাবে তা নির্ভর করছে মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ওপর। ওয়াশিংটন যদি ইরানের প্রস্তাবিত নিরাপত্তা গ্যারান্টি ও পর্যায়ক্রমিক শান্তি প্রক্রিয়ায় রাজি হয়, তবে অঞ্চলটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের হাত থেকে মুক্তি পেতে পারে। অন্যথায়, ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা ও ইরানের পাল্টা প্রতিশোধের হুংকারে এই সংকটের অবসান হওয়া কঠিন হবে। রাশিয়া, ওমান এবং পাকিস্তানের এই সম্মিলিত কূটনৈতিক তৎপরতা এখন পর্যন্ত ইরানকে একঘরে হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে, যা বিশ্বরাজনীতিতে রাশিয়ার প্রভাবকে আরও একবার প্রমাণ করল।
আরটির বিশ্লেষণ
