ইরান যুদ্ধকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন নেতানিয়াহু: কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

অনলাইন ডেস্ক

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ কোনও আকস্মিক সংঘাত নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান গঠন বা আকার পরিবর্তনে দীর্ঘমেয়াদি ইসরায়েলি পরিকল্পনার অংশ বলে মন্তব্য করেছেন কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জাসিম আল থানি।

আল-জাজিরার ‘আল-মুকাবালা’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই যুদ্ধের মাধ্যমে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং এর প্রভাব কয়েক দশক ধরে থাকবে।

তার মতে, এই সংঘাতের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট। একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর তথাকথিত ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ পরিকল্পনা নিয়ে সতর্ক করেন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য একটি যৌথ প্রতিরক্ষা জোট গঠনের আহ্বান জানান।

‘নেতানিয়াহুর বিভ্রমে’ যুদ্ধে জড়িয়েছেন ট্রাম্প
শেখ হামাদ দাবি করেন, ইসরায়েলের কট্টরপন্থী গোষ্ঠী বহুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে টানার চেষ্টা করে আসছিল। তার অভিযোগ, নেতানিয়াহু ১৯৯০-এর দশকে বিল ক্লিনটন প্রশাসনের সময় থেকেই তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ বাধানোর চেষ্টা করেছেন।

তিনি বলেন, আগের মার্কিন প্রশাসনগুলো পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে যেতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও এবার নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনকে ‘একটি বিভ্রম’ দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। তার ভাষায়, “তিনি ট্রাম্প তথা যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে পেরেছিলেন যে, যুদ্ধ খুব দ্রুত শেষ হবে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের সরকার ভেঙে পড়বে।”

শেখ হামাদ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিনির্ভর নীতিরও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আমেরিকার প্রকৃত শক্তি সবসময় বলপ্রয়োগ এড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতায় ছিল, শক্তি প্রয়োগে নয়।”

তার মতে, যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত সব পক্ষকেই আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে এনেছে। তিনি দাবি করেন, চলতি বছরের শুরুতে ওমানের মধ্যস্থতায় জেনেভায় চলা আলোচনাকে আরও দুই সপ্তাহ সময় দেওয়া হলে এই বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব ছিল।

এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হরমুজ প্রণালী
ইরানের কৌশল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে শেখ হামাদ বলেন, শুরুতে সামরিক হামলা সামাল দেওয়ার পর তেহরান বুঝতে পারে যে, হরমুজ প্রণালীকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। এরপর থেকেই তারা সমঝোতার বিষয়ে ধীর অবস্থান নেয়।

তিনি বলেন, “এই যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক ফলাফল হলো হরমুজ প্রণালীকে অস্ত্রে পরিণত করা।” তার মতে, ইরান এখন এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে কার্যত নিজেদের সার্বভৌম অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।

শেখ হামাদ অভিযোগ করেন, ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি ও শিল্প স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, যদিও এসব দেশ শুরু থেকেই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের রাজনৈতিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর ইরানের সঙ্গে সহাবস্থান করতেই হবে। এজন্য তেহরানের সঙ্গে সম্মিলিত ও খোলামেলা সংলাপের আহ্বান জানান তিনি।

‘গালফ ন্যাটো’ গঠনের আহ্বান
সাক্ষাৎকারে শেখ হামাদ বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বড় হুমকি ইরান, ইসরায়েল বা বিদেশি সামরিক ঘাঁটি নয়; বরং অঞ্চলটির অভ্যন্তরীণ বিভক্তি।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি ‘গালফ ন্যাটো’ ধরনের একটি যৌথ রাজনৈতিক ও সামরিক জোট গঠনের প্রস্তাব দেন। তার মতে, সৌদি আরবকে কেন্দ্র করে কয়েকটি সমমনা উপসাগরীয় দেশ নিয়ে এই জোট শুরু করা যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেও এখন ওয়াশিংটনের কৌশলগত মনোযোগ এশিয়া ও চীন মোকাবিলার দিকে সরে যাচ্ছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোকে ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

এক্ষেত্রে তুরস্ক, পাকিস্তান এবং মিসরের মতো আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি।

গাজা যুদ্ধ ও ফিলিস্তিন প্রশ্ন
গাজা পরিস্থিতি নিয়ে শেখ হামাদ বলেন, বেসামরিক মানুষ হত্যা সব পক্ষের জন্যই নিন্দনীয়। তবে তিনি গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে ‘নৈতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি অভিযোগ করেন, ইসরায়েল গাজা খালি করে ফিলিস্তিনিদের অঞ্চল ছাড়তে বাধ্য করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তার দাবি, ফিলিস্তিনিদের গাজা ছাড়তে অর্থের প্রস্তাবও দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর পশ্চিমা বিশ্বেও ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সহানুভূতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

শেখ হামাদ স্পষ্টভাবে বলেন, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ছাড়া হামাসকে নিরস্ত্র করার আলোচনা গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে তিনি সৌদি আরবের সেই অবস্থানের প্রশংসা করেন, যেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে।

সিরিয়া ও পুরোনো কূটনৈতিক তথ্য প্রকাশ
সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনে স্বস্তি প্রকাশ করেন শেখ হামাদ। তিনি জানান, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের শুরুতেই তিনি আসাদকে জনগণের কথা শোনার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

সাক্ষাৎকারে একটি পুরোনো কূটনৈতিক তথ্যও প্রকাশ করেন তিনি। শেখ হামাদ জানান, ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে কাতারের নেতৃত্ব তাকে তেহরানে পাঠিয়েছিল বিল ক্লিনটন প্রশাসনের একটি বার্তা পৌঁছে দিতে। সেই বার্তায় ইরানকে তাদের প্রাথমিক পারমাণবিক কর্মসূচি রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়া অথবা আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি জানানো হয়েছিল। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights