ধ্বংসের শেষ ধাপে কংস
এম এ শাহীন, সিদ্ধিরগঞ্জ
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ ঘুরে, স্থানীয়দের স্মৃতিচারণা এবং নথিপত্র ঘাঁটার মধ্য দিয়ে বেরিয়ে এসেছে কংস নদের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের করুণ চিত্র। ফতুল্লার শাহী মসজিদ এলাকার সত্তরোর্ধ্ব মতিন সরকার স্মৃতির পাতা উল্টাতে গিয়ে বলেন, ‘ধান-পাটবোঝাই শত শত মইন্না নৌকা গুণ টানতে দেখছি। নদীর পানি খাওয়ার মতো পরিষ্কার ছিল। বড় বড় সরপুঁটি, শিং, কই, বাইলা মাছ ধইরা খাইতাম। নদীর পার দিয়া হাঁটতে হাঁটতে কাঁচপুর যাওয়া যাইত। সেই নদ আজ পচা-আবর্জনায় ভরা খালে পরিণত হয়েছে।’
একই এলাকার আবদুল জলিল ব্যাপারী জানান, মুক্তিযুদ্ধের আগেও কংস ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। বিক্রমপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নৌকা ও লঞ্চ চলাচল করত এই নদ দিয়ে। তিনি বলেন, ‘পরিষ্কার পানি আর মাছে ভরা নদ ছিল এটি। এখন সেটা নোংরা খাল। কোথাও আবার সেই খালও নেই। সরেজমিন দেখা গেছে, একসময় উত্তরে শীতলক্ষ্যা থেকে দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার বিস্তৃত কংস নদ বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নথিতে সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৮ কিলোমিটারে। সিদ্ধিরগঞ্জ পুল থেকে আলীপুর পর্যন্ত অংশটুকুকে এখন ‘কংস খাল’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। ফতুল্লার মোতালেব খন্দকার বলেন, ‘পাটবোঝাই নৌকা, পাল তোলা ডিঙিতে নদ ছিল জমজমাট। এখন সব শেষ, নদটা নোংরা নালায় পরিণত হইছে।’ স্থানীয় প্রবীণদের মতে, ৫০-৬০ বছর আগেও কংস নদ ছিল এ অঞ্চলের যোগাযোগ, কৃষি ও ব্যবসার প্রধান মাধ্যম। বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, ষাটের দশকে ডিএনডি বাঁধ নির্মাণের পর থেকেই কংস নদের ধ্বংস শুরু হয়। নদীর দুই প্রান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়, ধীরে ধীরে নাব্য হারিয়ে নদটি খালে, পরে নর্দমায় পরিণত হয়েছে। ‘কংস নদীর তীরে’ বইয়ের লেখক কবি ইয়াকুব কামাল বলেন, বাঁধের কারণে নদের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, দুই মুখ বন্ধ হয়ে যায়। এরপরই শুরু হয় নদটির চূড়ান্ত পতন। এখন সেই খরস্রোতা নদটি ‘কংস খাল’ নামে পরিচিত। দখল হয়ে যাওয়া নদীর পুরো অংশ উদ্ধারের দাবি জানান তিনি। পরিবেশকর্মীরা বলছেন, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কংস নদ পুরোপুরি হারিয়ে যাবে। তবে পাউবো জানিয়েছে, আদালতের স্থগিতাদেশসহ নানা জটিলতায় উদ্ধার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঢাকা ডিভিশন-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শুভ আহমেদ বলেন, কংস খাল বা এটাকে আমরা কংস ছোট নদ বলি। ২০২৫ অর্থবছরে এর সংস্কার কাজ করা হয়েছে। তবে সিদ্ধিরগঞ্জ পুল এলাকায় এলজিইডি ও সিটি করপোরেশনের সড়ক এবং রেললাইনের কারণে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন ড্রেন দিয়ে ময়লা এসে খালটি ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আমাদের জরিপে ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার পাওয়া গেছে। এর বাইরে তথ্য পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
