বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের মাঝে এক নারীর নজরকাড়া উপস্থিতি, কে এই জো কুনফেই?

অনলাইন ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সম্মানে বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আয়োজিত রাজকীয় নৈশভোজে বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের অন্যতম ইলন মাস্ক, অ্যাপেল সিইও টিম কুকের মাঝখানে বসা এক নারী সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বিশ্বের বাঘা বাঘা সব ব্যবসায়ী ও নেতাদের মধ্যে থাকা ওই নারীর পরিচয় নিয়ে অনেকেই কৌতূহলী হয়ে উঠেছেন। তিনি আর কেউ নন, চীনের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী ব্যবসায়ী লেন্স টেকনোলজির কর্ণধার জো কুনফেই।

চলতি বছর মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসের করা বিশ্বের ক্ষমতাশালী নারীদের তালিকায় ৫৬ বছর বয়সী জো কুনফেই আছেন ২৮ নম্বরে। ১৯৭০ সালে চীনের হুনান প্রদেশের এক দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা জো পরিশ্রম আর অধ্যবসায় দিয়ে হয়ে উঠেছেন বিশ্বের নারী অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রতীক। চীনের কঠিন শ্রম পরিবেশে কোনো ধরনের পারিবারিক প্রভাব বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই জো যেভাবে নিজেকে বর্তমান অবস্থানে নিয়ে এসেছেন, তা গল্পকেও হার মানায়।

শুক্রবার (১৫ মে) চীনের শীর্ষ দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ডনাল্ড ট্রাম্পের সম্মানে শি জিনপিং আয়োজিত নৈশভোজে চীনের শীর্ষ ব্যবসায়ী হাইসেন্সের চেয়ারম্যান জিয়া শাওকিয়ান, ওয়ানশিয়াং গ্রুপের চেয়ারম্যান লু ওয়েইডিং, ফুয়াও গ্লাসের চেয়ারম্যান কাও হুই, এয়ার চায়নার চেয়ারম্যান লিউ তিয়েশিয়াং, কোম্যাকের চেয়ারম্যান হে দংফেং, লেনোভোর চেয়ারম্যান ইয়াং ইউয়ানচিং, শাওমির প্রতিষ্ঠাতা লেই জুনসহ প্রভাবশালী আরো অনেকে যোগ দিয়েছিলেন।

লেন্স টেকনোলজির কর্ণধার জো কুনফেই ছিলেন বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে। রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় তিনি তার দুই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহক অ্যাপলের সিইও টিম কুক এবং টেসলার প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কের মাঝখানে বসার সুযোগ পান। ১৯৭০ সালে হুনানের দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া জো মাত্র ১৫ বছর বয়সে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন। তাকে কাজের খোঁজে পাড়ি জমাতে হয় চীনের প্রযুক্তি নগরী শেনঝেনে। সেখানে তিনি কারখানায় শ্রমিকের কাজ শুরু করেন।

এরপর নিজের একটু একটু করে জমানো ২০ হাজার হংকং ডলার দিয়ে ১৯৯৩ সালে একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্টে ঘড়ির গ্লাসের ওপর স্ক্রিন প্রিন্টিংয়ের ব্যবসা শুরু করেন জো। সেখান থেকেই এক দশক পরে জন্ম নেয় ‘লেন্স টেকনোলজি’। চীনের হুনান প্রদেশের চাংশায় এই বহুজাতিক কোম্পানি এখন বিশ্বের স্মার্ট ডিভাইস, বিশেষ করে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট এবং পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির গ্লাস ও প্রতিরক্ষামূলক কাচ তৈরির শীর্ষ প্রতিষ্ঠান।

জো কুনফেই এখন বিশ্বের শীর্ষ নারী ধনীদের একজন, যার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১১ শ কোটি মার্কিন ডলার। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মাকে হারান জো। বাবা এক শিল্প দুর্ঘটনায় দৃষ্টিশক্তি এবং একটি আঙুল হারান। ফলে পরিবারকে সাহায্য করতে ১৫ বছর বয়সে জোকে গ্রাম ছেড়ে শেনঝেনে একটি কাচ কোম্পানিতে কাজ নিতে হয়। দিনরাত পরিশ্রম ও শেখার প্রবল ইচ্ছায় কারখানায় দিনে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করতেন তিনি। পরে শেনঝেন ইউনিভার্সিটির সান্ধ্যকালীন কোর্সেও ভর্তি হন। সেখানে জো অ্যাকাউন্টিং, ব্যবসা এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে পড়াশোনা করেন। তার লক্ষ্য ছিল নিজের প্রচেষ্টায় ভাগ্য পরিবর্তন করা।

জোর সামনে প্রথম বড় সুযোগ আসে ২০০৩ সালে। তখনকার শীর্ষ মোবাইল ফোন কোম্পানি মটোরোলা তাকে ‘আরএজেআর ভি৩’ ফোনের জন্য গ্লাসের স্ক্রিন তৈরির প্রস্তাব দেয়। কারণ তখন পর্যন্ত বেশিরভাগ ফোনের স্ক্রিন ছিল প্লাস্টিকের। মটোরোলার এই প্রজেক্ট সফল হওয়ার পর নকিয়া, স্যামসাং এবং এইচটিসির মত বড় কোম্পানিগুলোও জোর গ্রাহক হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালে অ্যাপল যখন আইফোন বাজারে আনে, তারা লেন্স টেকনোলজিকে সরবরাহকারী হিসেবে বেছে নেয়, যা জোকে পরিণত করে ধনকুবেরে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান অবস্থানেও জো নিজের কারখানার প্রতিটি সূক্ষ্ম কাজ এখনো নিজে বোঝেন। গ্লাস তৈরির সময় পানির তাপমাত্রা পরীক্ষা থেকে শুরু করে রাসায়নিক প্রক্রিয়ার জটিলতারও সমাধান দেন। প্রয়োজনে নিজেই মেশিন চালাতে শুরু করেন। কাজের তাগিদে অফিসের ভেতরেই থাকার ব্যবস্থা রেখেছেন, যাতে দিনের ১৮ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন।

বিনয়ী ও প্রচারবিমুখ জো অঢেল সম্পদের মালিক হওয়ার পরও অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করেন। তিনি বলেন, বাবার কাছ থেকে শেখা শৃঙ্খলাই তার বড় শক্তি। আর সাফল্যের চূড়ায় উঠে অহংকারী হওয়া বা বিপদে ভেঙে পড়া ঠিক নয়।

তথ্য সূত্র- সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights