ঈদ মানে বাড়ি ফেরা

মোহন রায়হান

অফিসে খাই। খাবার নিয়ে আসি। অফিস বন্ধ। বাইরের খাবার খাবো না। বন্ধুবান্ধবের বাসায় যেয়ে খেয়ে আসবো? আমার গাড়ি চালক শাহীন বাড়ি যাচ্ছে। বাইরে যে গরম! উপায় কি? বাধ্য হয়ে গতকাল দুপুরে অফিস শেষ করে মগবাজার মীনা বাজারে ঢুকেছিলাম, চিড়া, স্কিম মিল্ক, ফল, বিস্কুট ইত্যাদি শুকনো খাবার কিনতে। আগামী পাঁচ দিন অধিকাংশ সময় এসব খেয়েই কাটিয়ে দিতে হবে। উত্তাল সংগ্রামী দিনে- জেলে, আন্ডারগ্রাউন্ডে, পলাতক জীবনে, খেয়ে না খেয়ে থাকার অনেক অভ্যেস আছে। অসুবিধা হবে না।

সন্ধ্যায় প্রিয় তোহা মুরাদের অফিসে নানা রকমের প্রাকৃতিক শরবত আর সবজি খিচুড়ির নির্দোষ ইফতারি শেষে রাতে বাসায় ফিরি। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই একটি শিশু মন থাকে যাকে সব সময় নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। খাওয়া-দাওয়ায় আমার এত বাছ-বিচার সত্ত্বেও গতকাল মিনা বাজারে থেকে একসময়ের প্রিয় দু’প্যাকেট চিপস কিনে এনেছিলাম। রাতে টেলিভিশনে টক শো দেখতে দেখতে তার এক প্যাকেট খেয়ে ফেললাম। বন্ধুদের মনে আছে কিনা গত বছরের রোজার ঈদে, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বাসায় দাওয়াত খেয়ে এসে প্রচণ্ড পেট ব্যথা নিয়ে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। গতরাত বারোটার দিকে আমার সেই পুরনো তীব্র পেট ব্যথা আবার শুরু হলো। ব্যথা তো ব্যথা সে আর থামে না। বাড়তেই থাকে। এই নিয়ে কয়েকবার এই ব্যথা উঠলো। ভবনের কেয়ারটেকারকে ফোন করে ঘুম ভাঙালাম। বললাম, কাপড় পরো, রেডি হও, লিফট ছাড়ো, আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, আমার সেই পুরনো ব্যথা আজকে আবার উঠেছে। অসহ্য ব্যথায় দুমড়ে মুচড়ে যেতে যেতে নিজে শার্ট প্যান্ট পরে নিচে নেমে এলাম। কেয়ারটেকারকে সঙ্গে নিয়ে খানিক হেঁটে খানিক রিকশাতে হাসপাতালে গেলাম। ইমারজেন্সিতে ঢুকে সাওলের কনসালটেন্ট ডাক্তার ফারহানকে ফোন করে ইমারজেন্সির ডাক্তারকে ধরিয়ে দিলাম। ফারহান বলে দিল, কী করতে হবে। দুটো কম্বাইন্ড ইনজেকশন পুশ করলো আর চার চামচ সিরাপ খাইয়ে দিল। ঘণ্টা দুয়েক শুয়ে থেকে ব্যথা একটু কমলে মধ্যরাতে বাসায় চলে এলাম।
আজ সারাদিন একাকী বাসায় শুয়ে বসে পড়ে লিখে কাটাচ্ছি। নাভির ডান পাশে উপরের দিকে একটু একটু ব্যথা আছে তবে স্বাভাবিক একটু অস্বস্তি ছাড়া তেমন কষ্ট নেই।
শরীরটা দুর্বল। মনটা খারাপ। মাকে খুব মনে পড়ছে। আগামীকাল ঈদ। ঈদ মানে ছিল বাড়ি ফেরা। মায়ের কাছে ফেরা। জীবনে খুব কম ঈদ ছিল মায়ের কাছে ফিরিনি। কোন কোন বার ফিরতে না চাইলেও মায়ের আদেশ পালন করতে, মাকে খুশি রাখতে শেষ মুহূর্তে হলেও ফিরতে হয়েছে। সেই মা আজ নেই। মাত্র ৫ দিন আগে মায়ের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী ছিল। ইচ্ছে এবং প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও আর্থিক অনটনের কারণে মায়ের কাছে ফেরা হয়নি। যে কারণে মনটা আরও বেশি খারাপ।
বাড়ি যাব না জেনে পুত্রসম ডাক্তার ফারহান পরশুদিন বারবার বলেছিল, আমার বাসায় চলেন একসঙ্গে ঈদ করবো।’ বন্ধু ঝর্না গতকাল দুবার টেক্সট আর আজ সকালে ফোন করেছে ওর বাসায় চলে যেতে, ওর পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে। ওর পরিবারের সবাই আমার অতি আপনজন। সব সুখদুখের সাথী। বন্ধু কেএম কামাল, প্রিন্সিপাল আব্দুর রাজ্জাক ফোন করেছে তাদের বাসায় নিয়ে যেতে, একসঙ্গে ঈদ করতে। খবর পেয়ে বন্ধু কথা শিল্পী আনোয়ারা আজাদ টেক্সট করেছে, আমেরিকা থেকে বন্ধু, সহপাঠী খালেদা সিরাজী সকালে ফোন করে কথা বলেছে, জলি টেক্সট করেছে, বন্ধু লুৎফর ফোন করেছে। কেয়ার টেকার কুদ্দুস সকালে বাড়ি যাওয়ার আগে বলল, স্যার, এই অবস্থায় আপনাকে রেখে কীভাবে যাই? আমার বাড়িতে চলেন একসঙ্গে ঈদ করব। স্যার আমি গাড়ি ভাড়া করে আপনাকে নিয়ে যাব।”
আসলে কারো আমন্ত্রণই ফেলবার নয়। কার কাছে যাবো? আমার এই একাকীত্ব নিঃসঙ্গতা অসুস্থতা অসহায়ত্ব হয়তো সবাইকে কষ্ট দিচ্ছে। সবার আমন্ত্রণই অত্যন্ত আন্তরিকতাপূর্ণ, নিখাদ, অকৃত্রিম। কিন্তু কষ্টের আরেক নামই তো মোহন রায়হান। ওই যে কথায় আছে না -কষ্টে যাদের জীবন গড়া তাদের আবার কষ্ট কিসের?’ ভুল ভুল আর ভুল। কেবলই ভুল। হৃদয়াবেগ দিয়ে চলা মানুষের জীবন এমনই হয়। ভুলের পাহাড় চাপা বুকে যাদের বিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, তাদেরই একজন আমার আবার কষ্ট কিসের? আর একাকীত্ব? নিঃসঙ্গতা? সে তো আমার ১৮-১৯ বছর বয়সেই প্র্যাকটিস করা। কারাগারের সেলে এমনকি জেল-আন্দোলনের কারণে পানিশমেন্ট সেলেও দিনের পর দিন, বছরের পর বছর আমি একাকী কাটিয়েছি কৈশর এবং যৌবনের সন্ধিক্ষণ সময়ে।
আর এই পাঁচ দিন কি আমি একাকী কাটাতে পারবো না? অনাহার অর্ধাহারে থাকতে পারবো না? ওই যে চিড়া, মুড়ি, ফল, বিস্কুট নিয়ে ঢুকেছি নিঃসঙ্গ গুহায়, আদিম মানুষের মতন কাটিয়ে দেবো ৫ দিন অনায়াসে। এইতো আজ সারাদিন কিছুই খাওয়া হয়নি। সঙ্গে যদি থাকে বই আর আধুনিক সভ্যতার অন্যতম আবিষ্কার তথ্যপ্রযুক্তির সেরা উপহার স্মার্টফোন, গান। কিসের দুর্ভাবনা? কিসের দুশ্চিন্তা? এই লেখা লিখতে লিখতে হঠাৎ ফোন এলো, ডাকসুর সাবেক ভিপি, সাবেক এমপি আখতারউজ্জামান, আখতার ভাইয়ের।
তিনি বললেন, হোয়াটসঅ্যাপে দেখো একটা ছবি পাঠিয়েছি তোমার আর নাজমুল হক প্রধানের। একটা সেরা ঈদ উপহার তোমাদের জন্য। ঈদের আগের দিনের এই বিকেল খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক মানুষের স্মৃতি মনে পড়ে। খুঁজতে খুঁজতে আমার সংগ্রহের তোমাদের এই ছবিটা পেয়ে গেলাম। আমার একাকিত্বের কথা শুনে তিনি বললেন, একাকি এরকম সময়ে, নীরবে ফাঁসির হুকুম মেনে নিতে পারো,
নীরবে সবচয়ে খুশির খবর মেনে নিতে পারো।” হোয়াটসঅ্যাপ খুলে ছবিটা দেখে অবাক হয়ে গেলাম! ১৯৯১ সালে নিউওয়ার্কে “বাংলাদেশ সোসাইটি, আমেরিকা” কর্তৃক এরশাদের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের ছাত্র নেতাদের সংবর্ধনা সভার একটি দুর্লভ ছবি নাজমুল হক প্রধান এবং আমার। আখতার ভাইয়ের ভাষায়, ঈদ উপলক্ষে আমাদের দুজনের জন্য সত্যি একটি অতুলনীয় উপহার। ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা আখতার ভাই। ছবিটি প্রধানকেও পাঠালাম।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ রোজার ইফতারের আজান পড়বে। ইতোমধ্যে হঠাৎ তাপদগ্ধ প্রকৃতির বিরুদ্ধে আকাশের শীতলতার বজ্র নির্ঘোষ। খানিক কালবৈশাখী ঝড় আর বৃষ্টি বর্ষণে। হয়তো ভয়াবহ তাপমাত্রা কমে আসবে। তাহলে হয়তো বেরোনো যাবে। উবার, সিএনজি, রিকশায় ছুটতে পারবো বন্ধুদের আমন্ত্রণ রক্ষার্থে। ঈদের সকাল, দুপুর, বিকেল কিংবা রাতে। একেক সময় একেকজনের বাড়িতে। না কমলে পাঁচ দিন ঘরেই কাটিয়ে দেবো।

ঈদ মোবারক। ঈদ মোবারক। ঈদের প্রীতি ও শুভেচ্ছা সবাইকে।
লেখক: কবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights