অকার্যকর মুদ্রানীতির চক্করে ডুবছে অর্থনীতি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ

ফারুক মেহেদী

সাধারণ মানুষের মনের অবস্থা বেশ নাজুক! মূলত পকেটের দুরবস্থাই তাদের ‘মনের জ্বালা’ বাড়িয়ে চলেছে! বিশেষ করে নিত্যপণ্যের লাগামহীন দামের ধকল সইতে না পেরে মানুষ এখন অনেকটাই হতাশ ও বিক্ষুব্ধ। কারণ কয়েক বছর ধরে চাল, ডাল, তেলসহ হেঁশেলের জিনিসপত্র কিনতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে তাদের আয়ের বড় একটি অংশ।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকার নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় করতে পারেনি। পরে ইউনূস সরকারের সময় তা আরো লাগামহীন হয়েছে। বর্তমান বিএনপি জোট সরকারের সময়েও জিনিসপত্রের দামের পাগলা ঘোড়ার লাগাম টানা যাচ্ছে না। এখনো তা ছুটছে তো ছুটছেই! কিন্তু সব সরকারই পণ্যের দামে লাগাম টানতে বা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একই কৌশল অনুসরণ করেছে।

আওয়ামী সরকার একমাত্র সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিয়েছিল। ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এসে সুদের হার আরো বাড়িয়েছে। বিএনপি সরকারও আগের ধারায়ই চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিতে ভর করে ‘একমাত্র সুদের হার’ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
অর্থনীতির বইয়ের ভাষায় চিরায়ত রীতি মেনে ‘সুদের হার বাড়ালে’ বাজারে মুদ্রা সরবরাহ কমবে। মানুষ কেনাকাটা কম করবে। হাতের টাকা খরচ না করে তা বেশি সুদের আশায় ব্যাংকে জমা করবে। আবার যাঁরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসার প্রসার, নতুন বিনিয়োগ বা বিলাসী জিনিসপত্র কিনে থাকেন, তাঁরাও বেশি সুদ দিয়ে ঋণ করা থেকে বিরত থাকবেন। তাহলে টাকা বাজারে কম যাবে। এভাবে ‘স্বয়ংক্রিয়’ ভাবে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে। কিন্তু না। মূল্যস্ফীতি কমে না; বরং সর্বশেষ হিসাবেও তা আগের চেয়ে বেড়েছে। অথচ এক মূল্যস্ফীতি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘গলদঘর্ম’ হয়ে মুখস্থ বিদ্যার মতো সুদের হারকে বাইবেল মেনে ‘উচ্চে’ তুলে ধরে আছে! কিন্তু মূল্যস্ফীতি কমল না, অথচ অর্থনীতির আর সব খাত দুর্বল হতে শুরু করেছে।

ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্যারোলিন এলভিস সম্প্রতি বিখ্যাত গণমাধ্যম ‘প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে’ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পরিষ্কার করে উল্লেখ করেছেন যে একমাত্র সুদের হার বাড়িয়ে কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। কারণ মূল্যস্ফীতি হওয়ার ভিন্ন ভিন্ন কারণ রয়েছে। ওই সব কারণ একটি মাত্র উপায়ে সমাধান সম্ভব নয়।

ক্যারোলিন বলেছেন, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু সুদের হার বাড়ানোর দিকে নজর দেয়। সেই কৌশল এখন ঠিকমতো কাজ করে না। বিশ্বের অন্যসব দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিরও অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রথাগত অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দফায় দফায় ‘সুদের হার’ বৃদ্ধি করছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রবণতা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারব্যবস্থাপনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেবল সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে হিতেবিপরীত হতে পারে।

ক্যারোলিন তাঁর নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে বর্তমান মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খলের সংকট। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি বা কাঁচামালের দাম বাড়লে দেশের ভেতরে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। সুদের হার বাড়ালে ঋণের খরচ বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম আরো বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ সুদের হার দিয়ে ‘চাহিদা’ নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও ‘সরবরাহজনিত মূল্যবৃদ্ধি’ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

ক্যারোলিন এলভিস যুক্তি দিয়েছেন যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতি কমাতে চিরাচরিতভাবে সুদের হার বাড়ায়। কিন্তু বর্তমান মূল্যস্ফীতি ‘ডিমান্ড পুশ’ বা চাহিদাজনিত নয়; বরং তা ‘কস্ট পুশ’ বা ব্যয়জনিত। জ্বালানি তেল এবং কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে যখন মূল্যস্ফীতি হয়, তখন সুদের হার বাড়িয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। অথচ বাংলাদেশে তাই করা হচ্ছে, যা ‘তাত্ত্বিকভাবে’ ঠিক হলেও বাস্তবে অনেকটাই ভুল।

সুদের হার বাড়ানোর ফলে ঋণের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এতে নতুন কলকারখানা স্থাপন বা ব্যবসা সম্প্রসারণ থমকে দাঁড়ায়। এলভিসের মতে, এটি অর্থনীতিকে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা প্রবৃদ্ধি-বিনিয়োগবিহীন মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে। যেখানে উচ্চমূল্যের পাশাপাশি বেকারত্বও বাড়বে।

ক্যারোলিনের নিবন্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো ‘গ্রিডফ্লেশন’ বা করপোরেট প্রফিট কিংবা অতিমুনাফা। তিনি দেখিয়েছেন যে অনেক বড় বড় কম্পানি উৎপাদন খরচ বাড়ার অজুহাতে পণ্যের দাম প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বাড়িয়েছে শুধু মুনাফা বৃদ্ধির জন্য। সুদের হার বাড়িয়ে এই করপোরেট আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির একটি বড় অংশ কৃত্রিম। নিবন্ধে যেমনটি বলা হয়েছে, কিছু বড় করপোরেশন বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী দাম নির্ধারণে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে। বাংলাদেশে চাল, ডাল, চিনি বা পেঁয়াজের মতো নিত্যপণ্যের বাজারে প্রায়ই সিন্ডিকেটের প্রভাব দেখা যায়। সুদের হার বাড়লে সাধারণ ব্যবসায়ীরা চাপে পড়লেও এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটগুলোর ওপর তার প্রভাব পড়ে না। ফলে মুদ্রানীতি এখানে অকার্যকর হয়ে পড়ে।

উচ্চ সুদের হারকে নিবন্ধে একটি ‘শাস্তিমূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বাংলাদেশে সুদের হার অনেক বেশি বেড়ে গেলে ক্ষুদ্র ও মাঝারিসহ কমবেশি সব উদ্যোক্তাই নতুন বিনিয়োগ বন্ধ করে দেয়। এতে উৎপাদন কমে যায় এবং বেকারত্ব বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়। যখন উৎপাদন কমে, তখন বাজারে পণ্যের ঘাটতি দেখা দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দেয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতির একটি প্রধান কারণ হলো টাকার অবমূল্যায়ন। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানীকৃত সব পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। এটি কেবল সুদের হার বাড়িয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতিশীলতা এবং রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহের ভারসাম্য।

ক্যারোলিনের নিবন্ধে যথার্থই বলা হয়েছে যে মূল্যস্ফীতি কেবল একটি ‘প্রযুক্তিগত’ সমস্যা নয়, এটি একটি ‘রাজনৈতিক পছন্দ’ বটে। সরকার যদি সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি মেনে একদিকে সুদের হার বাড়ায়, অন্যদিকে ঘাটতি বাজেট মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রচুর টাকা ছাপিয়ে ঋণ নেয়, তবে সুদের হার বৃদ্ধির কোনো সুফল সাধারণ মানুষ পায় না। বাংলাদেশে মুদ্রানীতি এবং সরকারের রাজস্বনীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব প্রায়ই পরিলক্ষিত হয়।

এক মূল্যস্ফীতি সহনীয় করতে ‘একদফা এক দাবির’ মতো কেবল সুদের হার বাড়াতে থাকলে এবং তা পর্যালোচনা করে অন্য কোনো করণীয় নির্ধারণ না করলে ক্রমেই বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধি-বিনিয়োগহীন মন্দার দিকে ধাবিত হবে। এক পর্যায়ে তা মূল্যস্ফীতির যে বর্তমান স্তর রয়েছে, সেটি আরো বাড়বে। তখন এমন অবস্থা হবে যে তা সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনা অনেক কঠিন হয়ে যাবে।

ক্যারোলিন এলভিসের নিবন্ধের কথা ধরে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এখানে উচ্চ সুদের হারেও মূল্যস্ফীতি সহনীয় হয়নি। কিন্তু ঠিকই বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উচ্চ সুদের হারে কোনো উদ্যোক্তা ঋণ নিচ্ছে না। এত সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা কিংবা বিনিয়োগ লাভজনক হচ্ছে না। ফলে বিনিয়োগ হচ্ছে না, বেকারদেরও চাকরি হচ্ছে না। এতে মানুষের আয় কমে যাচ্ছে। আবার এ মূল্যস্ফীতি যেহেতু চাহিদাজনিত না হয়ে ‘কস্ট পুশ’ বা ব্যয়জনিত, তাই বিনিয়োগহীন অবস্থায় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যাবে। তখন পণ্যের সরবরাহজনিত সংকটের কারণে পণ্যের দাম আরো বাড়বে। এতে মূল্যস্ফীতিও কমে না আবার বিনিয়োগ-ব্যবসার প্রসার না হওয়ায় বাজারে পণ্যের সংকট হয়, তখন আরো দাম বাড়ে। মূল্যস্ফীতি আরো বাড়ে। তখন কিছু প্রতিষ্ঠান ‘অতিমুনাফা’ করে। যাদের আমরা সিন্ডিকেট করে বলে মনে করি।

এমন অবস্থায় সরকারের উচিত শুধু সুদের হারকে মূল্যস্ফীতি কমানোর একমাত্র হাতিয়ার না ভেবে একটি কম্প্রিহেনসিভ বা সার্বিক কৌশল নেওয়া। এর মধ্যে সুদের হারকে আরো যৌক্তিক করা বা প্রয়োজনে সহনীয় করা, তাতে যদি মূল্যস্ফীতি বাড়েও তখন বিনিয়োগ বাড়বে, প্রবৃদ্ধির চাকা ঘুরবে, যা মূল্যস্ফীতির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে। এ ছাড়া কঠোর আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া, কৃষি ও শিল্প খাতে ভর্তুকি দেওয়া, প্রণোদনা দিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, যাতে আমদানিনির্ভরতা কমে, ডলারের বাজারে অস্থিরতা কমিয়ে টাকার মান স্থিতিশীল করা, আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজস্ব জ্বালানি উৎসর উন্নয়ন করা ইত্যাদি। এর পাশাপাশি যেসব করপোরেট প্রতিষ্ঠান অতিমুনাফা করে বা সিন্ডিকেট করে বলে মনে করা হয়, তাদের নজরদারির মধ্যে এনে তাদের ওপর ‘উইন্ডফল ট্যাক্স’ বা অতিমুনাফার শাস্তিস্বরূপ কর আরোপ করা যেতে পারে।

যেহেতু বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি সুদের হার বাড়ানোর পরও কমছে না। উল্টো বিনিয়োগ থমকে গিয়ে প্রবৃদ্ধি আটকে যাচ্ছে। সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে, বেসরকারি খাতে মন্দা চলছে; সেটি মাথায় নিয়ে এখনই অর্থনীতি চাঙা করার কৌশল নিতে হবে। না হলে এক মূল্যস্ফীতির চক্রে সুদের হারকে বাড়িয়ে রেখে অন্য সব কিছুকে ‘স্থবির’ করে দেওয়ার মতো ‘সর্বনাশ’ ডেকে আনা ছাড়া আর কিছুই হবে না। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্টদের এখনই এ বিষয়ে ত্বরিত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, কালের কণ্ঠ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights