খেলাপির ভয়ে চামড়াশিল্পে ঋণ কমাচ্ছে ব্যাংক

শাহেদ আলী ইরশাদ

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে চামড়া শিল্পে ঋণ বিতরণে আগ্রহ হারাচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় এ খাতে ঋণ বিতরণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ব্যাংকগুলো। এর প্রভাব পড়েছে নতুন ঋণ বরাদ্দেও।

চলতি বছর কোরবানির পশুর চামড়া কেনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক এবং একটি বেসরকারি ব্যাংক মোট ২৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। তবে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, আগের ঋণ নিয়মিত পরিশোধ করেছেন এমন গ্রাহকরাই নতুন ঋণসুবিধা পাবেন।

চামড়া শিল্পের প্রধান কাঁচামাল পশুর চামড়া, যার প্রায় ৭০ শতাংশ সংগ্রহ করা হয় কোরবানির ঈদে। এ সময় চামড়া ক্রয়, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করতে বিপুল পরিমাণ কার্যকর মূলধনের প্রয়োজন হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই অর্থায়নের বড় অংশ জুগিয়ে আসছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খেলাপি ঋণ বাড়ায় ব্যাংকগুলোর আগ্রহ কমেছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক চামড়া খাতে ঋণপ্রবাহ সচল রাখতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরোনো খেলাপিদের ক্ষেত্রেও কিস্তি আদায়ের শর্ত কিছুটা শিথিল করেছে, যাতে ব্যবসায়ীরা নতুন করে অর্থায়ন পেতে পারেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছে, চামড়াশিল্পসংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের দ্রুত পর্যাপ্ত ঋণ দিতে হবে, যাতে ঈদের সময় কাঁচা চামড়া সংগ্রহে কোনো সংকট তৈরি না হয় এবং কোনো চামড়া নষ্ট বা পাচার না হয়। ব্যাংকগুলোর ঘোষিত বরাদ্দ অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ৯১ কোটি টাকা রেখেছে অগ্রণী ব্যাংক। এ ছাড়া রূপালী ব্যাংক ৭০ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংক ৬০ কোটি টাকা, যমুনা ব্যাংক ৫০ কোটি টাকা এবং সোনালী ব্যাংক ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, ঈদের আগেই ঋণের অর্থ বিতরণ করা হবে। তবে যেসব গ্রাহক আগের ঋণ সময়মতো পরিশোধ করতে পারেননি, তাঁরা নতুন ঋণের জন্য বিবেচিত হচ্ছেন না। এক বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা মূলত চামড়া ক্রয়, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য কার্যকর মূলধন দিয়ে থাকি। গত বছর ৩৬ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিলাম, এ বছর তা বাড়িয়ে ৫০ কোটি টাকা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ঋণ বিতরণও শুরু হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, সব ব্যবসায়ী প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ পাচ্ছে না। কারণ ঋণ নবায়নের ক্ষেত্রে আগের অর্থ পরিশোধের শর্ত কঠোরভাবে দেখা হচ্ছে।’ অন্যদিকে ট্যানারি মালিকরা বলছেন, ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ ঋণ বরাদ্দের কথা বলছে বাস্তবে তার পুরোটা পাওয়া যায় না। অধিকাংশ ব্যবসায়ী খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় নতুন অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহিন আহমেদ বলেন, ‘ব্যাংকগুলো শত শত কোটি টাকার ঋণের কথা বললেও বাস্তবে আমরা সেই অর্থ পাই না। ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্পর্কের ভিত্তিতেই অর্থায়ন হচ্ছে, নতুন করে বড়পরিসরে ঋণ দেওয়া হচ্ছে না।’ নগদ অর্থের সংকট মোকাবিলায় কোরবানির আগেই সরকারের বকেয়া প্রণোদনার অর্থ ছাড়ের দাবি জানিয়েছেন ট্যানারি মালিকরা। তাঁদের মতে, পর্যাপ্ত অর্থায়ন না হলে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে সংকট তৈরি হতে পারে, যা পুরো চামড়া শিল্পের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights