নিম্নমধ্যবিত্তের যে গল্প কেউ জানে না!

নাজমুল হাসান

পবিত্র ঈদুল আজহার প্রথম দিন, সকালে রাজধানীর অলিতে গলিতে দেখা গেছে কোরবানির পশু জবাই করার তোড়জোড়। তবে দুপুর গড়িয়ে কিছুটা বিকেল নামতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। রাস্তার ধারে কোরবানির গরুর মাংসের পসরা সাজিয়ে বসেছেন অনেকে। কেউ হাঁকছেন, এই এদিকে কেজি ৭৫০, কেউ আবার হাঁকছেন ৭০০, ৭০০ বলে। আর এসব ভাসমান মাংসের দোকানে ভিড় করছেন কিছু মানুষ।

যাদের মুখ একটু স্বাভাবিকের তুলনায় উসকোখুসকো। তারা যেন একটু ইতস্তত। মনের ভেতর হয়তো ভয়, যদি কেউ দেখে ফেলে; তবে কী হবে?

পবিত্র ঈদুল আজহা যেমন ত্যাগের মহিমায় মুসলিম উম্মাহকে উদ্ভাসিত করে, তেমন নিম্নবিত্তের মানুষদের জন্য একটু মাংস আহারের সুযোগ নিয়েও আসে। সারা বছর জীবনের ঘানি টানতে টানতে যারা নুন ভাতের জোগাড় করতেই হিমশিম খান, তাদের কাছে এ ঈদেরও তাই আছে বিশেষ মাহাত্ম্য।

তবে উচ্চবিত্ত আর সামর্থ্যবান মধ্যবিত্তের মাঝখানে আরও এক শ্রেণির মানুষ আছেন, যাদেরকে বইয়ের ভাষায় বলা হয় নিম্নমধ্যবিত্ত। তারা এই দুর্মূল্যের বাজারে কুরবানিও দিতে পারেন না, আবার মানুষের দুয়ারে হাজির হতে পারেন না দু-টুকরো মাংসের আশায়।

এই নিম্নমধ্যবিত্তের মানুষেরাই এই ভ্রাম্যমাণ কোরবানির মাংসের দোকানের প্রধান ক্রেতা। তারাই একটু কম দামে এখান থেকে মাংস কিনে থাকেন। ৭৫০ দাম হাঁকানো দোকানিই দরদামের একপর্যায়ে ৬৫০ কিংবা মানভেদে ৬০০তে নামে। ক্রেতা চুপ করে ব্যাগটা বাড়িয়ে দেন। টাকা পরিশোধ করে ফেরেন ঘরে।

এ এক মেট্রোপলিটন উপাখ্যান। ঊঁচু ঊঁচু দালানের ভেতরে চাপা পড়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মানুষের দীর্ষশ্বাসও বটে। মধ্যবাড্ডায় কথা হলো তেমনই কম সামর্থ্যের কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে। তাদের একজন জানালেন, দুই সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি যাবেন সে সামর্থ্যও নেই। আবার যা ছুটি পেয়েছেন, তাতেও এতো দৌড়ঝাঁপ করে বাড়ি গিয়ে পোষাবে না। তার ওপর ঢাকাতে কোরাবানি করবেন সেই সামর্থ্যও নেই। তাই এই ভাসমান দোকানের মাংসই শেষ ভরসা।

এইসব ক্রেতাদের সবার গল্পে একটা অদ্ভুত মিল আছে। সাধ আর সামর্থ্যে বিস্তর ফারাক। এদের কারো হিসাব মেলে না ঠিকঠাক। আরেকজন ক্রেতার কণ্ঠেও তাই আক্ষেপের বিষাদধ্বনি। জানালেন, এই ভাসমান দোকানের মাংসের দরদামও তার সামর্থ্যের চেয়ে বেশি। পাশ থেকে আরেক ক্রেতা বললেন, এবার বুঝি জিভেই লাগাম টানতে হবে। চালডালের হিসাব মেলাতেই হিমশিম, গরুর মাংস স্রেফ বিলাসিতা।

এতোক্ষণ তো ক্রেতার কথা হলো এই মাংসের দোকানের রসদ আসে কোথা থেকে? সে প্রশ্নের উত্তরেও সেই অভাবের গল্প। নিম্নবিত্তের যারা মাংস আনেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে, তারাই এই ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের কাছে এমন মাংস বিক্রি করে দেন। বহু রকমের মাংস মেলানো থাকায় দামটাও যুতসই পান না। এমন একজন বিক্রেতাই নর্দা ফুটওভার ব্রিজের নীচে বসে জানালেন তার কথা।

বললেন, তিনি ঈদের এই সময়টাতে ঢাকায় থাকেন, বাড়ি যান ঈদের এক কিংবা দুই দিন পর। বিভিন্ন বাড়ি ঘুরে ঘুরে যে মাংস পান। তার কিছুটা রাখেন বাড়ির জন্য। আর কিছুটা বিক্রি করেন এই ভ্রাম্যমাণ দোকানে। তাতে বাড়ি ফেরার গাড়ি ভাড়া হওয়ার পরেও কিছু বাড়তি টাকাও থাকে।

আবার অনেকে আছেন ঢাকার বিভিন্ন বাসাবাড়িতে মাংস কাটেন চুক্তি ভিত্তিতে। টাকার পাশাপাশি সৌজন্যস্বরূপ তারা কিছু মাংসও পান। সেসস মাংসের বড় একটা অংশ হাত বদল হয়ে আসে, ভ্রাম্যমাণ এসব দোকানে।

মৌসুমি ভ্রাম্যমাণ দোকানের বিক্রেতা আব্দুর রশিদের (ছদ্মনাম) কথা হয় মধ্যবাড্ডার বাজার গলির মাথায়। তিনি জানালেন, বিভিন্ন জনের কাছ থেকে এমন মাংস কিনে গড়পড়তা মিলিয়ে বিক্রি করেন। কেজিতে অন্তত ৫০ টাকা লাভ পেলে বিক্রি করে দেন।

আরও একজন কোরবানির মাংস বিক্রেতা জানালেন, তিনি মূলত মৌসুমী ফলের ব্যবসায়ী। কোরবানির দিনে একটু বাড়তি আয়ের আশাতে ফল বেচা সেই ভ্যানেই মাংসের পসরা সাজিয়েছেন।

বাজার গলিতে বহু বছর ধরে মুদির দোকান পরিচালনা করা আসলাম হাওলাদার জানালেন, প্রতিবছরই এমন মাংসের দোকান বসে তার দোকানের আশপাশে। অনেকেই মাংস কিনে নেন। কেউ আবার দরদাম করেই চলে যান। তার মতে, মানুষ নিরুপায় হলেই কেবল হাজিরা দেন এইসব দোকানে।

এভাবেই এগিয়ে যায় মেট্রোপলিটন ঢাকা। পয়সাকড়ির হিসেবের অলিগলি গলিয়েই ছোটে মানুষ। যার টাকা আছে, সে উড়ায়। আর যার নেই, সে খুঁজে নেয় কোরবানির মাংসের দোকানের মতো বিকল্প পথ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights