বিদ্রোহী প্রার্থী ও সহিংসতার আশঙ্কা বিএনপির

শফিকুল ইসলাম সোহাগ

আগামী অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এই স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলো বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ অনেক রাজনৈতিক দল বেশ কিছু আসনে একক প্রার্থী ঘোষণা করায় তারা নির্বাচনি মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল বিএনপিতে নির্বাচন ঘিরে বিদ্রোহী প্রার্থী ও সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ হিসেবে দায়িত্বশীলরা বলছেন, দলীয় প্রতীক না থাকায় এই নির্বাচনে বিএনপির একক প্রার্থী নির্ধারণ করা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে পড়বে। এতে স্থানীয় দ্বন্দ্ব, প্রভাব বিস্তার ও সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়তে পারে। নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ ব্যাপক আকার ধারণ করার আশঙ্কা রয়েছে। জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সরকারপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বলেছেন স্থানীয় নির্বাচন শিগগিরই হবে; প্রার্থীদের প্রস্তুতি নিতেও বলেন তিনি। যদিও নির্বাচনের সেই দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হয়নি। তা ছাড়া নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি। নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে তারা তফসিল ঘোষণা করবে। তবে রাজনৈতিক দলগুলো যার যার অবস্থান থেকে প্রস্তুতি নেবে এটাই স্বাভাবিক। জানা যায়, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে এখন থেকেই সব রকম প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। এই সুযোগে সারা দেশে সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তৃত করার সুযোগ কাজে লাগাতে চায় দলটি। গত ৯ মে রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বিএনপি ও এর তিন সহযোগী সংগঠন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বড় পরিসরে এটি ছিল বিএনপির প্রথম সাংগঠনিক মতবিনিময় সভা। বৈঠকে তারেক রহমান স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করার বার্তা দেন। বৈঠকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন আসনে দলীয় নেতাদের বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার প্রসঙ্গও ওঠে। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সম্ভাব্য বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। জানা গেছে, বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিরুৎসাহিত করতে বিভাগীয় সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে চলার আহ্বান জানাবেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, দলের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির নেতা-কর্মীরা একমত হতে পারবে কি না; তা নিয়ে সংশয় আছে। যেহেতু ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারম্যানের কঠোর বার্তা সত্ত্বেও অর্ধশতাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। তাই স্থানীয় নির্বাচনেও এর পুনরাবৃত্তি ঘটে কি না, তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।

দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হওয়ায় আওয়ামী লীগের অপেক্ষাকৃত ‘ক্লিন ইমেজ’ সম্পন্ন স্থানীয় প্রভাবশালীরাও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে। দলীয় প্রতীক না থাকায় ভোটারদের কাছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। এই সুযোগটি অনেকেই নিতে চাইবে। বিএনপির কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের সিটি ও পৌরসভার মেয়র-কাউন্সিলরদের বরখাস্ত করা হয়। ভেঙে দেওয়া হয় জেলা ও উপজেলা পরিষদ। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্যরা এখনো বহাল থাকলেও বেশির ভাগই পলাতক বা কাজে অনুপস্থিত। কিছু কিছু ইউনিয়ন পরিষদে ইউএনও বা সরকারি কর্মকর্তাদের বাড়তি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও সব সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদ প্রশাসক পেয়েছে। সেক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে ধাপে ধাপে পৌরসভা, উপজেলা এবং সবশেষে সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ইতি টানার সম্ভাবনাই বেশি থাকছে। তারা বলছেন, দলীয় প্রতীক না থাকায় একক প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে মাঠে থাকেন, তবে ভোট ভাগাভাগির সুবিধা নেবে প্রতিপক্ষ।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম স্থানীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেছেন, চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমের পর অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পন্নের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights