শত্রু শিবিরে খেলা, দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে একাট্টা ইরানি ফুটবলাররা

স্পোর্টস ডেস্ক
চলতি জুন মাসেই পর্দা উঠতে যাচ্ছে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ ফিফা বিশ্বকাপ-২০২৬ আসরের। তবে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এবারের বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাচ্ছে ইরান। আয়োজক দেশগুলোর অন্যতম একটি দেশের (যুক্তরাষ্ট্র) সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধাবস্থার মধ্যেই বিশ্বমঞ্চে মাঠে নামতে হবে তাদের।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আগ্রাসনের পর ৮ এপ্রিল থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও অঞ্চলে এখনো চূড়ান্ত শান্তির দেখা মেলেনি। এই চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা ইরানের বিশ্বকাপ প্রস্তুতিকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তুলেছে, যার বড় কারণ তাদের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই।

ভিসা জটিলতা ও উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে ফুটবলারদের মানসিক ও কৌশলগত প্রস্তুতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। মার্কিন দূতাবাসে ভিসার আবেদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ইরান দলকে তাদের পূর্বনির্ধারিত ক্যাম্প পরিবর্তন করে তুরস্কের আন্টালিয়া ও রাজধানী আঙ্কারায় দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় কাটাতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য আঙ্কারায় মেক্সিকান দূতাবাসের সহায়তায় মেক্সিকোর ভিসা নিশ্চিত হয়েছে এবং স্কোয়াডের সবার প্রবেশানুমতি মিলেছে বলে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা জটিলতার কারণে অ্যারিজোনার টুসন শহরের পূর্বনির্ধারিত মূল অনুশীলন ক্যাম্পটি সরিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া সীমান্তবর্তী মেক্সিকোর টিজুয়ানা শহরে নিতে বাধ্য হয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। সব ঠিক থাকলে আগামী ১৪ জুন, অর্থাৎ প্রথম ম্যাচের ঠিক আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রাখবে দলটি। ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসের ইঙ্গলউডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে তাদের বিশ্বকাপ অভিযান। এরপর ২১ জুন বেলজিয়াম এবং ২৬ জুন সিয়াটলে মিসরের মুখোমুখি হবে তারা।

এই চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজেদের সেরাটা দিতে মরিয়া ইরানি ফুটবলাররা। দলের অভিজ্ঞ ২৯ বছর বয়সী মিডফিল্ডার সাইদ এজাতোলাহি, যিনি এর আগে ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপেও দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, পরিস্থিতি মোটেও সহজ নয়। দেশের ভেতরের খবর এবং রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ স্বাভাবিকভাবেই খেলোয়াড় ও সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। তবে তাদের প্রথম দুটি ম্যাচ লস অ্যাঞ্জেলেসের কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে বসবাসরত বিশাল ইরানি প্রবাসী জনগোষ্ঠীর বড় সমর্থন তারা গ্যালারিতে পাবেন বলে আশা করছেন। এই সমর্থন যেমন প্রেরণা জোগাবে, তেমনি প্রত্যাশার বিশাল চাপও তৈরি করবে। কিন্তু ইরানিরা যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত, তা তারা মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে বিশ্বকে দেখাতে চান।

দলের ২৪ বছর বয়সী তরুণ ফুটবলার মোহাম্মদ ঘোরবানি, যিনি ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন, তিনি জানান যে তারা বিশেষ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেলেও মাঠের খেলোয়াড় হিসেবে তাদের মূল কাজ অনুশীলন ও খেলায় মনোযোগ দেওয়া। যুদ্ধের কারণে দেশের মানুষ যে অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছেন, ফুটবলাররা সেই ক্ষতে কিছুটা প্রলেপ দিতে চান। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ভালো ফলাফল এনে দেশের মানুষের মুখে একটুখানি হাসির জোগান দেওয়া।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের ডামাডোল, শীর্ষ নেতাদের হারিয়ে ফেলার শোক আর মার্কিন ভূখণ্ডে খেলার মানসিক চাপ সামলে এক পতাকার নিচে নিজেদের ঐক্য ও শক্তি প্রমাণ করাই এখন ইরানি ফুটবলারদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্র: আল জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights