যুদ্ধ বিস্তারের ইঙ্গিত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি ইরানের

অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা এখন স্থবির অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ একজন শীর্ষ উপদেষ্টা। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনায় অগ্রগতি না হলে পরিস্থিতি আরও বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে গড়াতে পারে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই বলেন, দুই দেশের আলোচনায় বর্তমানে ‘ডেডলক’ তৈরি হয়েছে এবং এই অচলাবস্থা কাটাতে উদ্যোগ নিতে হবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই।

তিনি বলেন, “আলোচনা স্থবির অবস্থায় আছে। ট্রাম্পকে এই অচলাবস্থা ভাঙতে হবে। এখন সিদ্ধান্তের বল তার কোর্টে।”

২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদই প্রধান বাধা
রেজাই’র মতে, যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ থাকা প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার ইরানি সম্পদ মুক্তির ওপরই সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

ইরান নীতিগতভাবে দাবি করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনও অন্তর্বর্তী চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই ১২ বিলিয়ন ডলার এবং পরবর্তী ধাপে আরও ১২ বিলিয়ন ডলার মুক্ত করতে হবে।

তবে মার্কিন কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন যে, এই অর্থ ছাড় দিলে ওয়াশিংটনের হাতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ চাপের একটি হাতিয়ার দুর্বল হয়ে পড়বে।

রেজাই বলেন, এই অর্থ ছাড় ‘আস্থা গঠনের পরীক্ষা’ হিসেবে কাজ করবে। তার ভাষায়, “এটি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের জন্য একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। এটি আমাদের নিজেদের অর্থ, যুক্তরাষ্ট্রের নয়।”

যুদ্ধ আরও বিস্তারের হুঁশিয়ারি
সাক্ষাৎকারে রেজাই কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র আবারও সামরিক সংঘাতে জড়ায়, তবে যুদ্ধ শুধু পারস্য উপসাগরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

তিনি বলেন, ইরান প্রয়োজনে সামরিক অভিযান বিস্তৃত করে হরমুজ প্রণালী, ভারত মহাসাগর, বাব আল-মানদাব প্রণালী, লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে।

তার দাবি, “আমরা যুদ্ধকে নতুন মাত্রা দেব এবং যেখানে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে, সেখানে আঘাত হানব।”

তবে তিনি একই সঙ্গে বলেন, বর্তমানে নতুন যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।

কৌশলগত জলপথ নিয়ে দাবি
ইরানের প্রভাবশালী এই নিরাপত্তা উপদেষ্টা আরও দাবি করেন, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী ইরান ও ওমান যৌথভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে। তার মতে, এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় অংশ পরিবাহিত হয়।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এই জলপথ ব্যবহারের জন্য ইরান ‘রক্ষণাবেক্ষণ ফি’ আদায় করতে পারে, যা কোনও ধরনের শুল্ক নয়, বরং পরিচালন ব্যয়ের অংশ।

পারমাণবিক চুক্তি ও ট্রাম্প প্রসঙ্গ
রেজাই যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন পারমাণবিক চুক্তি নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে ট্রাম্পের সরে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, ভবিষ্যৎ আলোচনায় আস্থা তৈরি কঠিন।

তিনি আরও জানান, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির সঙ্গে ট্রাম্পের সম্ভাব্য বৈঠকের বিষয়টি ‘এখনই অসম্ভব’।

এদিকে ট্রাম্প সম্প্রতি মন্তব্য করেন, তিনি ও খামেনি নাকি ‘ভালো সম্পর্ক’ বজায় রাখছেন এবং ভবিষ্যতে বৈঠক হলে তা সম্মানের হবে।

যুদ্ধ ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে মন্তব্য
রেজাই দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা ইরানের জন্য ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তিনি বলেন, এটি ইরানের ৪৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে দেশটি যুদ্ধে জয়ী হয়েছে বলে তারা মনে করে।

তিনি আরও বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র স্থল হামলার কথা চিন্তা করে, তবে ইরান ‘তার প্রকৃত সামরিক সক্ষমতা বিশ্বকে দেখাবে’।

রেজাই ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) শীর্ষ কমান্ডার ছিলেন এবং পরে ইরানের নীতি নির্ধারণী সংস্থা এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলে যোগ দেন। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রায়িসির প্রশাসনেও ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, তার বক্তব্য ইরানের নিরাপত্তা ও নীতি নির্ধারণী মহলের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত বহন করে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েনকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। সূত্র: সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights