রামিসা হত্যা: কিভাবে হবে রায় কার্যকর

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায় মাত্র ১৯ দিনের মাথায় ঘোষণা করেছেন আদালত। কার্যত ছয় কার্যদিবসের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন উঠেছে বিচারিক আদালতের এই রায় কিভাবে ও কত সময়ে কার্যকর হবে?

আইনজীবীরা বলছেন, রায় কার্যকর করতে হলে এখনও তিনটি বিচারিক ধাপ বাকি রয়েছে। বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে আইন অনুযায়ী হাইকোর্টের অনুমোনের (ডেথ রেফারেন্স) বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পাশাপাশি জেল আপিল দাখিলের সুযোগ পাবেন আসামিরা। হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে আপিল বিভাগে আপিল আপিল করতে পারবেন দণ্ডিতরা। সেখানেও দণ্ড বহাল থাকলে সুযোগ পাবেন রিভিউ করার। এরপরই মূলত রায় কার্যকরের পর্যায়ে আসবে।

এদিকে, সুপ্রিমকোর্টের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ২০১৮ সালে হাই কোর্ট বিভাগে দাখিল হওয়া ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি চলছে। সাধারণ গতিতে রামিশা হত্যার ডেথ রেফারেন্স শুনানি হতে সময় লাগবে কয়েক বছর।

তবে রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, রামিসার মতো নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার মতো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা (ডেথ রেফারেন্স ও আপিল) শুনানিতে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের কথা বলেছেন প্রধান বিচারপতি। আগামী রবিবার থেকে এই বেঞ্চ কার্যকর হবে। বিচারিক আদালতের রায়ের পর নিজ কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য জানান।

ব্রিফিংয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে নিম্ন আদালতের রায়ে দু’জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার রায়টি কিন্তু চূড়ান্ত নয়, যতক্ষণ না পর্যন্ত রায়টি হাইকোর্ট কর্তৃক অনুমোদিত হয়। এ ধরনের ঘটনায় সব সময় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কথা বলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস বলেন, যতক্ষণ না সেই শাস্তি কার্যকর হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

মানুষের যে উদ্বেগ, নিম্ন আদালত কোনো মামলায় রায় দিলেও আপিল শুনানিতে বিলম্ব ঘটার কারণে সে রায় কার্যকর মানুষ দেখতে পান না, বিলম্ব ঘটে, এই বিষয় উন্মুক্ত আদালতে আজ প্রধান বিচারপতির দৃষ্টিতে আনেন বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস।

তিনি বলেন, ‘প্রধান বিচারপতিকে এটাও বলেছি যে দেশের নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণের জন্যে, সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্যে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিমকোর্ট যে ভূমিকা পালন করছেন, সেটি কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে মানুষের কাছে প্রতিভাত হয় না।…প্রধান বিচারপতির কাছে অনুরোধ করেছি যে মানুষের যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা, অত্যন্ত যৌক্তিক। এটা নিরসনের জন্য প্রধান বিচারপতির উদ্যোগী ও কার্যকর ভূমিকা রাখা উচিত।’

অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস আরও বলেন, ‘তখন প্রধান বিচারপতি এই বিচারের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে এই জাতীয় মামলা, অর্থাৎ পল্লবীর শিশুসহ এই সমস্ত মামলাগুলো শুনানির জন্যে হাই কোর্টে একটি সুনির্দিষ্ট বেঞ্চ উনি গঠন করবেন, যেটা আগামী রবিবার থেকে কার্যকর হবে।’

ডেথ রেফারেন্স বিষয়ে আইনে যা আছে:

ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারার বিধান অনুযায়ী, অধস্তন আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে তা কার্যকরে উচ্চ আদালতের অনুমোদন ও শুনানি হতে হয়। এজন্য অধস্তন আদালতের রায়ের অনুলিপি ও মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হলে এটি ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) হিসেবে নথিভুক্ত এবং শুনানির জন্য পেপারবুক (মামলার রায়সহ যাবতীয় নথি) প্রস্তুত হয়। পাশাপাশি কারাগারে থাকা আসামি হাইকোর্টে আপিল কিংবা জেল আপিলের সুযোগ পান।

সুপ্রিমকোর্টের গত ১০ বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ডেথ রেফারেন্স হিসেবে নথিভুক্ত হওয়া এসব মামলা শুনানির জন্য প্রস্তুত হতে সময় লাগে পাঁচ বছরের বেশি। বর্তমানে হাইকোর্টের পৃথক চার বেঞ্চে ২০১৮ সালে নথিভুক্ত হওয়া ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি চলছে বলে সুপ্রিমকোর্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে ব্যক্তিক্রমও রয়েছে। আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলার ক্ষেত্রে অনেক সময় অগ্রাধিকারভিত্তিতে পেপারবুক তৈরি ও শুনানির নজিরও রয়েছে হাইকোর্টে।

সুপ্রিমকোর্টের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হাই কোর্টে বিচারাধীন ডেথ রেফারেন্সের সংখ্যা এক হাজার ২৭২টি।

বিচারিক আদালতের রায়ের পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরবর্তী ধাপ জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কোনো ফৌজদারি মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড হলে তা কার্যকরে হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে। এটি ডেথ রেফারেন্স মামলা হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি দণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের জেল আপিল, নিয়মিত আপিল ও বিবিধ আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। ডেথ রেফারেন্স এবং এসব আপিল ও আবেদনের ওপর সাধারণত হাইকোর্টে একসঙ্গে শুনানি হয়ে থাকে।

তিনি বলেন, হাইকোর্টে দণ্ড বহাল থাকলেও আপিল বিভাগে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। সেখানে সাজা বহাল থাকলে রিভিউ করতে পারবেন আসামি। এরপরই মূলত চূড়ান্তভাবে বিচার শেষ হবে। কারাবিধি অনুযায়ী দণ্ড কার্যকরের আগে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাওয়ার সুযোগ পাবেন আসামি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights