অন্ধকার ভয় পাওয়া সেই কিশোরই এখন ছড়াচ্ছেন বিস্ময়কর আলো

১৯৭১ সালের ২৮ জুন, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ার আকাশতলে যার জন্ম হয়েছিল, কে জানত একদিন সেই শিশুটিই অংক কষে হার মানাবে গোটা পৃথিবীকে? বয়স তার ৫৫, প্রায় বাংলাদেশের সমবয়সী এই মানুষটি আজ কেবল ধনকুবের নন, তিনি যেন জীবন্ত এক বিস্ময়। এক হাজার বিলিয়ন ডলারের পাহাড়সম সম্পদ নিয়ে তিনি আজ পৃথিবীর সকল হিসেবনিকেশের বাইরে। যেখানে দ্বিতীয় ধনী ল্যারি পেজের সম্পদও তার এক-তৃতীয়াংশ ছুঁতে হিমশিম খায়, সেখানে ইলন মাস্ক এক অনন্য উচ্চতায় আসীন। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম হয়নি তার, বরং তার শৈশব ছিল ভাঙা কাঁচের ওপর হাঁটার মতো ক্ষতবিক্ষত এক উপাখ্যান।

অ্যাসপারগার সিনড্রোমের অমোঘ ছায়ায় বেড়ে ওঠা একলা বালক, যাকে তার নিজের বাবা-মা পর্যন্ত বুঝতে ভুল করেছিলেন। কানে শোনে না ভেবে ডাক্তারের কাছে ছোটা সেই কিশোর আসলে ডুব দিয়ে থাকত কল্পনার অতল সমুদ্রে। সামাজিক মেলামেশার কঠিন গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাওয়া মাস্কের শৈশব ছিল অনাদর আর ভুল বোঝাবুঝির এক দীর্ঘ বিষাদগাথা। স্কুলের বারান্দায় সহপাঠীদের বুলিং আর পিটুনিতে রক্তাক্ত হওয়া সেই কিশোরের শরীরে তখন কেবল আঘাতই লাগেনি, বরং জমা হয়েছিল অদম্য জেদ আর প্রতিশোধের এক অলিখিত শপথ।

অন্ধকারকে ভয় পাওয়া সেই ছোট্ট মাস্ক যখন বিজ্ঞানের পাতায় পড়লেন, ‘অন্ধকার কেবল ফোটনের অনুপস্থিতি’, তখনই যেন তার ভেতরের ভয়ের দেয়াল ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মাত্র ৯ বছর বয়সে এনসাইক্লোপিডিয়া মুখস্থ করে ফেলা ছেলেটি বুঝে গিয়েছিল, জ্ঞানের আলোই পারে সব অন্ধকার দূর করতে। আজ তিনি সেই আবিষ্কারেরই কারিগর। যে ছেলেবেলায় বইয়ের পাতায় নিজেকে খুঁজে পেত, সেই মানুষটিই এখন পৃথিবী ছাড়িয়ে মহাকাশের বুক চিরে নতুন এক সভ্যতা গড়ার স্বপ্ন দেখছেন।

কানাডার কনকনে শীতের মাঝে দিনে মাত্র এক ডলারে টিকে থাকার সেই সংগ্রাম কি কেউ কল্পনা করতে পারে? সুপার মার্কেটের ফেলে দেওয়া বাসি খাবার খেয়ে পেট ভরা আর ঘরে ঘরে চকলেট বিক্রি করা সেই কিশোরটিই একদিন গড়ে তুলবে ডিজিটাল যুগের সাম্রাজ্য, এটি ছিল এক অকল্পনীয় বাস্তব। দক্ষিণ আফ্রিকার একরোখা সামরিক শাসনের খাঁচা ভেঙে পালিয়ে আসা সেই তরুণ জানত, তার গন্তব্য সাধারণ জীবন নয়, তার গন্তব্য অসীম।

জটিল, একাকী আর চরম দারিদ্র্যের আগুনে পুড়ে যে ইস্পাত তৈরি হয়েছিল, আজ সেটিই ইলন মাস্ক। আজ তিনি শুধু সাফল্যের নাম নন, তিনি মহাকাব্যের জীবন্ত চরিত্র। কেউ তাকে বলে পাগল, কেউ বলে সবজান্তা, আবার কেউ তাকে চেনে আগামীর ত্রাতা হিসেবে। পৃথিবীর ইতিহাসে সবথেকে ধনবান এই মানুষটির গল্প আসলে কেবল টাকার গল্প নয়; এটি হলো জেদ, একাকীত্ব আর অসম্ভবকে জয় করার এক রূপকথার বাস্তব রূপ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights