খুনের উপত্যকা রাউজান

মুহাম্মদ সেলিম, চট্টগ্রাম

খুনের উপত্যকায় পরিণত হয়েছে চট্টগ্রামের রাউজান। শতকোটি টাকার বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ আর চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে গত ২২ মাসে ঝরেছে অন্তত ৩০টি তাজা প্রাণ। বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, প্রতিটি কিলিং মিশন বাস্তবায়িত হচ্ছে এক অভিন্ন ও নিখুঁত ছকে। ভাড়াটে পেশাদার শুটার দিয়ে দিনদুপুরে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করছে অদৃশ্য গডফাদারদের কয়েকটি ডেথ স্কোয়াড। খুনের এই অভিন্ন প্যাটার্ন ও নেপথ্যের চক্রগুলোকে এরই মধ্যে চিহ্নিত করার দাবি করেছে জেলা পুলিশ; তবু রাউজানের মাটিতে থামছে না রক্তের হোলিখেলা।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘রাউজানে এ পর্যন্ত যতগুলো খুনের ঘটনা ঘটেছে, তার নেপথ্যে কয়েকটি চক্রের নাম উঠে আসছে। এরই মধ্যে চক্রগুলোকে চিহ্নিত করেছি। রাউজানের খুন নিয়ন্ত্রণে বিশেষভাবে কাজ করছে পুলিশ। দ্রুত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারব।’

এ বিষয়ে কথা হয় জেলা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন- রাউজানের গত দুই বছরে হওয়া খুনের প্যাটার্ন অভিন্ন। কিলাররা সিএনজি ট্যাক্সি কিংবা মোটরসাইকেলে করে স্পটে আসে। গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে দ্রুত সময়ের মধ্যে স্পট ত্যাগ করে। এতে বোঝা যাচ্ছে, একই জায়গা থেকে খুনের পরিকল্পনাগুলো করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্টে ১৫ বছরের একচ্ছত্র রাজনৈতিক আধিপত্যের পতনের পর রক্তের হোলিখেলা শুরু হয় চট্টগ্রামের রাউজানে। ক্ষমতার পালাবদলের পর এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, বালু মহালের নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ঝরতে থাকে একের পর এক তাজা প্রাণ। খুনের উপত্যকায় পরিণত হওয়া এ উপজেলায় ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ১৪ জুন ২০২৬ পর্যন্ত ২২ মাসে অন্তত ৩০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০টির অধিক খুন ছিল রাজনৈতিক কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার এবং সিন্ডিকেটকেন্দ্রিক। বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে রাউজানে চলমান এই সিরিজ খুনের পেছনের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। খুনগুলোর পেছনে কাজ করছে সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। এর মধ্যে বালু ব্যবসা অন্যতম। রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া সীমান্ত ঘেঁষা কর্ণফুলী ও হালদা নদীর বালু উত্তোলনের শতকোটি টাকার বাণিজ্য। আগস্ট ২০২৪-এর পর পুরোনো সিন্ডিকেটের পতন হলে নতুন একাধিক গ্রুপ এই বালু মহালের দখল নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এর জের ধরে ঘটতে থাকে একের পর এক খুনের ঘটনা। স্থানীয় বাজার নিয়ন্ত্রণ, ইট-মাটির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, সিএনজি স্ট্যান্ড, ব্রিক ফিল্ড (ইটভাটা) এবং সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার ও চাঁদাবাজির একক নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়েও এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘটছে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন একটি নির্দিষ্ট দলের শক্ত ঘাঁটি থাকার পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা দখল করতে গিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলো অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়েছে। নিজ দলের ভিতরেই এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে নিশ্চিহ্ন করতে রক্তের হোলিখেলায় মেতে উঠেছে। প্রায় প্রতিটি কিলিং মিশনের পেছনে ঘুরেফিরে উঠে আসছে কিছু ‘অদৃশ্য গডফাদারের’ নাম। এরা সরাসরি মাঠে না থেকে পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব খুনের নেপথ্যে ঘুরেফিরে আসছে কয়েকটি বাহিনীর নাম। এ ছাড়া প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকা কিছু নেতাও রয়েছে, যারা হঠাৎ করে ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে এসেছেন। নিজেদের এলাকা ‘ক্লিয়ার’ রাখতে এবং প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে তারা এই খুনের নির্দেশ দিচ্ছেন।

অভিন্ন প্যাটার্নে খুন : অনুসন্ধানে রাউজানের সিরিজ খুনের অভিন্ন প্যাটার্ন পাওয়া গেছে। সব কিলিং মিশন পেশাদারির সঙ্গে পরিচালিত হয়। কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারীদের বেশির ভাগের বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। তারা বহিরাগত হওয়ায় চিনতে পারেন না স্থানীয়রা। খুনের আগে নিজস্ব লোকাল ইনফর্মার বা ‘স্পটার’ দিয়ে রেকি করানো হয়। টার্গেট কখন কোথায় যাচ্ছে, চা খাচ্ছে বা সিএনজিতে উঠছে, তার নিখুঁত তথ্য শুটারদের কাছে সরবরাহ করে এরা। পাঁচ থেকে সাতজনের একটি ডেথ স্কোয়াড মূলত সিএনজি ট্যাক্সি বা মোটরসাইকেলে করে আসে। প্রকাশ্য দিবালোকে কয়েক মিনিটের মধ্যে কিলিং অপারেশন সম্পন্ন করে। কিলাররা শুধু গুলি করেই ক্ষান্ত হয় না, শরীরের বিভিন্ন অংশে গুলির পর সর্বশেষ এলজি দিয়ে মাথায় গুলি করে মৃত্যু শতভাগ নিশ্চিত করে। সিসিটিভি ক্যামেরা ফাঁকি দিতে তারা হেলমেট বা মাস্ক পরে থাকে। মিশনগুলোতে মূলত সস্তা ও সহজলভ্য ‘এলজি’ ব্যবহার করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights