প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে সাধারণ জ্বর

নিজস্ব প্রতিবেদক

নরসিংদী সদরের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগমের (৫৬) সাত দিন ধরে তীব্র জ্বর। তার ছেলে মাসুদ হোসেন বলেন, মায়ের জ্বর না কমায় হাসপাতালে ভর্তি করে ডেঙ্গু, টাইফয়েড টেস্ট করানো হয়- কিন্তু সেটা নেগেটিভ আসে। অ্যান্টিবায়োটিকে জ্বর নিয়ন্ত্রণে না এসে অবস্থার অবনতি হতে থাকলে ঢাকার মালিবাগের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেছি। অসংখ্য পরীক্ষা করেও কোনো কারণ ধরা পড়ছে না, কিন্তু মায়ের অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশজুড়ে মৌসুমি জ্বরের প্রকোপ বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, অনেক রোগীর ডেঙ্গু ও টাইফয়েড পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেও দীর্ঘদিন ধরে জ্বর কমছে না। কেউ কেউ নিউমোনিয়া, রক্তে সংক্রমণ বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছেন। কয়েকটি ক্ষেত্রে সাধারণ জ্বরের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, দেশে ডেঙ্গু ও টাইফয়েডের বাইরে অন্য কোনো সংক্রামক রোগ, বিশেষ করে ম্যালেরিয়া বা অন্যান্য ভাইরাসজনিত জ্বর ছড়িয়ে পড়ছে কি না। রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে দেখা যাচ্ছে, অনেক রোগীর পাঁচ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত জ্বর স্থায়ী হচ্ছে। ডেঙ্গুর এনএস১, আইজিএম কিংবা টাইফয়েড পরীক্ষায় রোগ ধরা না পড়লেও রোগীরা দুর্বলতা, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বমি, ডায়রিয়া এবং রক্তের প্লাটিলেট কমে যাওয়ার মতো সমস্যায় ভুগছেন।

এ ব্যাপারে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দেশে বর্তমানে ম্যালেরিয়া শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে মূলত র‌্যাপিড ডায়াগনস্টিক টেস্ট (আরডিটি) ব্যবহার করা হয়। প্রয়োজন হলে রক্তের স্লাইড প্রস্তুত করে মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে পরজীবী শনাক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে দেশে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব তুলনামূলকভাবে কমে যাওয়ায় অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মাইক্রোস্কোপভিত্তিক দক্ষতা ও অবকাঠামোর ব্যবহারও কমে এসেছে। আরডিটি পরীক্ষাগুলো প্রধানত প্লাজমোডিয়াম ফালসিপারাম ও প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স শনাক্ত করার জন্য তৈরি, কারণ দেশে ম্যালেরিয়ার অধিকাংশ সংক্রমণ এই দুই প্রজাতির মাধ্যমেই ঘটে। অতীতে প্লাজমোডিয়াম ম্যালেরিয়া ও প্লাজমোডিয়াম ওভালে এর সংক্রমণও পাওয়া গেছে, তবে সংখ্যা কম হওয়ায় এগুলো নিয়মিত পরীক্ষার আওতায় খুব একটা আসে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি চট্টগ্রামের কয়েকটি বেসরকারি ব্লাডব্যাংকে রক্তদাতা স্ক্রিনিংয়ের সময় ম্যালেরিয়া পজিটিভ দাতা শনাক্ত হয়েছে, যাদের কারও মধ্যে রোগের দৃশ্যমান উপসর্গ ছিল না। বিষয়টি ইঙ্গিত করে যে উপসর্গবিহীন সংক্রমণ এখনো সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি এবং নীরবে বিদ্যমান থাকতে পারে। দীর্ঘদিন বড় আকারের প্রাদুর্ভাব না থাকার কারণে চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের মনোযোগ স্বাভাবিকভাবেই অন্য রোগের দিকে বেশি চলে গেছে।’

দেশে ম্যালেরিয়া প্রধানত পার্বত্য চট্টগ্রামসহ ১৩টি জেলায় বেশি দেখা যায়। তবে দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে মানুষের চলাচল বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের ধরন বদল এবং মশার বিস্তারের কারণে ম্যালেরিয়া নিয়ে নতুন করে সতর্ক হওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রাম মা শিশু ও জেনারেল হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক ডা. মিশু তালুকদার বলেন, ‘সব জ্বর ডেঙ্গু বা টাইফয়েডের কারণে হয় না। বিভিন্ন ভাইরাল সংক্রমণ, ম্যালেরিয়া, স্ক্রাব টাইফাস, রিকেটশিয়াল ফিভার, লেপ্টোস্পাইরোসিস, নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস কিংবা রক্তে সংক্রমণ (সেপসিস) থেকেও গুরুতর জ্বর হতে পারে। অনেক সময় রোগের শুরুতে কিছু পরীক্ষার ফল নেগেটিভও আসতে পারে। তাই দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অচেতনতা, রক্তচাপ কমে যাওয়া বা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। জ্বরকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে, বিশ্রামে থাকতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্যান্য ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। জ্বর তিন দিনের বেশি স্থায়ী হলে বা কোনো বিপৎসংকেত (শ্বাসকষ্ট, তন্দ্রাচ্ছন্নতা, খিঁচুনি, খেতে না পারা, প্রস্রাব কমে যাওয়া,গায়ে দানা) দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশের কিছু অঞ্চলে, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সীমান্তবর্তী এলাকায়, ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি এখনো রয়েছে। জ্বরের সঙ্গে কাঁপুনি, ঘাম হওয়া, দুর্বলতা বা ভ্রমণের ইতিহাস থাকলে ম্যালেরিয়ার কথাও বিবেচনায় রাখতে হবে। ম্যালেরিয়া সন্দেহ হলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত, কারণ দেরি হলে এটি গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights