ফুটবল উন্মাদনায় দেশ

আসিফ ইকবাল

পরিবার পরিজন নিয়ে কেউ মধ্যরাতে হাজির। কেউ আবার খুব ভোরে ফজরের নামাজ পড়ে হাজির হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। হয়তো ভেবেছিলেন সামনের সারিতে বসে প্রিয় দল আর্জেন্টিনা, প্রিয় ফুটবলার লিওনেল মেসির খেলা দেখবেন। কিন্তু হাজির হয়েই ভিরমি খেয়েছেন! তার আগেই উপস্থিত আকাশি-সাদা জার্সি পরা হাজার হাজার দর্শক। খেলা শুরুর আগে থেকেই গানের সুরে সুর মিলিয়ে হাজার হাজার ফুটবপ্রেমী মেসি নামাঙ্কিত প্রিয় জার্সি পরে, পতাকা উড়িয়ে কোরাস গাইছেন, ‘মেসি, মেসি, মেসি…’, ‘আর্জেন্টিনা, আর্জেন্টিনা, আর্জেন্টিনা…’। বিদেশি কোনো নাগরিক উপস্থিত হয়ে বুঝতেই পারবেন না এমন আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর্জেন্টিনা নয়, বাংলাদেশে হচ্ছে। এমন দৃশ্য শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, ইসলামী, রাজশাহী, ড্যাফোডিল, নর্থসাউথ, আইইউবি বিশ্ববিদ্যালয়সহ গোটা দেশের পাড়া-মহল্লার। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আলবিসেলেস্তারা খেলবে, ‘ফুটবল জাদুকর’ মেসি খেলবেন- এসব দেখতে বাংলাদেশের লাখ লাখ আর্জেন্টিনার সমর্থক বসে পড়েছেন টিভি পর্দার সামনে, বিরাট বিরাট জায়ান্ট স্ক্রিনের সামনে। সবার ভিতরে উৎসবের আমেজ, সাজসাজ রব। ফুটবলপ্রেমীদের এমন পাগলাটে উন্মাদনায় গোটা বিশ্ব জেনে গেছে ফুটবল উন্মাদনায় ভাসছে বাংলাদেশ। ফুটবল জোয়ারে ভেসে গেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে ক্যানসাস সিটিতে খেলা। অথচ ম্যাচ উন্মাদনায় ভেসেছে বাংলাদেশ। এবারই প্রথম এরকম ফুটবল উন্মাদনা, তা নয়। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যেবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, সেবারও মেসিদের সমর্থনের জোয়ারে ভেসে গিয়েছিল এ দেশের ১৮ কোটি জনতা। ৪৮ দেশ নিয়ে বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে ১১ জুন। উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকা। কিন্তু ফুটবল উন্মাদনার শুরু ১৪ জুন ব্রাজিল-মরক্কো ম্যাচ দিয়ে। আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া ম্যাচ দিয়ে শতভাগ পূর্ণতা পায় সেই ফুটবল উন্মাদনার। এর মধ্যে খেলে ফেলেছে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি, দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স ও উরুগুয়ে এবং একবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ও ইংল্যান্ড। কিন্তু এসব দলের ম্যাচ নিয়ে যতটা উৎসবীয় আমেজ, তার লাখো গুণ বেশি উন্মাদনা আর্জেন্টিনা ম্যাচ ঘিরে। আর্জেনিটনার প্রতি, মেসির প্রতি বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের এমন ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন ১৪-১৫ হাজার মাইল দূরের আর্জেন্টিনার নাগরিক। তারা শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাংলাদেশের নাগরিকদের ভালোবাসায় বুকে টেনে নিয়েছেন। বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা নিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আলবিসেলেস্তাদের কোচ লিওনেল স্কালোনি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এ দেশের ফুটবলপ্রেমীদের।

বাংলাদেশের নাগরিক বিশ্বকাপ ফুটবল দেখা শুরু করে ১৯৭৪ সাল থেকে। সেবার পশ্চিম জার্মানি-নেদারল্যান্ডস ফাইনাল বেতবুনিয়া ভূ-উপকেন্দ্রের মাধ্যমে সরাসরি বিটিভিতে সম্প্রচার করা হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ড্যানিয়েল প্যাসারেলার অধিনায়কত্বে আর্জেন্টিনা। সেবার নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ফাইনাল পরের দিন রেকর্ডকৃত অংশ বিটিভিতে দেখানো হয়। বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবল সরাসরি সম্প্রচার শুরু হয় ১৯৮২ সালে। সেবারও ফুটবল মহাযজ্ঞ নিয়ে এ দেশের ক্রীড়াপ্রেমীদের মাঝে উৎসবের আমেজ ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে প্রকৃত ফুটবল উন্মাদনা শুরু ১৯৮৬ সালে। দিয়াগো ম্যারাডোনা জাদুকরী ফুটবলে সম্মোহিত হয়ে পড়েছিল বিশ্ব। তখন থেকেই বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা সমর্থক হয়ে উঠেন আর্জেন্টিনার। ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’র মতো ম্যারাডোনা একাই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে আর্জেন্টিনা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে দুটি গোল করেন ম্যারাডোনা, যার একটিকে বলা হয় ‘শতাব্দীর সেরা গোল’। অন্য গোলটি নিয়ে বিতর্ক এখনো চলমান। সমালোচকরা বলেন, হাত দিয়ে গোল করেছেন ম্যারাডোনা। ম্যারাডোনা বলেছিলেন, গোলটি করেছেন ‘ঈশ্বরের হাত’ দিয়ে।’ ম্যারাডোনার জাদুকরী ফুটবলের পর বাংলাদেশের ফুটবপ্রেমীরা সমর্থক হয়ে ওঠেন আর্জেন্টিনার। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ফুটবল খেলা দেখতে রাতদিন এক করে ফেলেন। স্থবিরতা নেমে আসে কর্মকাণ্ডে। যদিও ১৯৮৬ সালের পর বিশ্বকাপের পরের শিরোপা জিততে আর্জেন্টিনাকে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছিল ৩৬ বছর। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার হাত ধরে উন্মাদনার শুরু। লিওনেল মেসির হাত ধরে উন্মাদনার শতভাগ পূর্ণতা। মেসি প্রথমবার বিশ্ব খেলেন ২০০৬ সালে। এবার নিয়ে টানা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলছেন। বিশ্বের খুব কম সংখ্যক ফুটবলার ছয়টি করে বিশ্বকাপ খেলছেন। ছয়টি করে বিশ্বকাপ খেলছেন পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও মেক্সিকোর ও’চোয়া। গতকাল ভোরে মেসি তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ২০০তম ম্যাচ খেলেছেন। বিশ্বকাপে খেলেছেন ২৭টি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের একটি গোল ছিল ‘ট্রেডমার্ক’ বাঁকানো শটে। ২০০তম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করা প্রথম ফুটবলার মেসি গড়ছেন অনেক রেকর্ড। আলজেরিয়া ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টাইন ফুটবল জাদুকরের জাদুকরী অর্জনে রোমাঞ্চিত ও আন্দোলিত ফুটবলবিশ্ব। কিন্তু মেসি এসব ব্যক্তিগত অর্জনে খুব বেশি রোমাঞ্চিত নন। আর্জেন্টাইন ফুটবল জাদুকর চলতি বিশ্বকাপ শুরু করেছিলেন ১৩ গোল নিয়ে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের পর তার গোলসংখ্যা ১৬টি। তিনি এখন যুগ্মভাবে শীর্ষে রয়েছেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার। জার্মান কিংবদন্তির পাশে নাম লিখে উচ্ছ্বসিত মেসি, ‘ক্লোসার পাশে এই জায়গায় থাকতে পারা সম্মানের, রোনালদোও আছেন কাছেই। তবে এসবের কোনো মূল্য নেই। এমবাপ্পেও আছেন কাছেই, দুটি গোল করেছেন। দিনশেষে, এসব কেবলই সংখ্যা, এর বেশি কিছু নয়।’ এবারই প্রথম ৪৮ দল নিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল হচ্ছে। খেলা হবে ১০৪টি। ফাইনাল ২০ জুলাই। ১১ জুন থেকে ২০ জুলাই; বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা বুঁদ হয়ে থাকবেন বিশ্বকাপ ফুটবল জ্বরে। প্রাণভরে উপভোগ করবেন আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইংল্যান্ডের খেলা। ফুটবল সৌকর্য দেখবেন মেসি, এমবাপ্পে, রোনালদো, নেইমারদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights