আট বছরেও নিজস্ব ক্যাম্পাস পায়নি নওগাঁ মেডিকেল কলেজ

বাবুল আখতার রানা, নওগাঁ

চিকিৎসক তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করেছিল নওগাঁ মেডিকেল কলেজ। কিন্তু প্রতিষ্ঠার আট বছর পরও নিজস্ব ক্যাম্পাসের মুখ দেখেনি প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে ২৫০ শয্যার নওগাঁ আধুনিক হাসপাতালের একটি অংশে চলছে পাঠদান, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও ব্যবহারিক শিক্ষা। শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়লেও অবকাঠামো, আবাসন ও জনবল সংকট রয়ে গেছে আগের মতোই। বিশেষ করে অনুমোদিত শিক্ষকের প্রায় অর্ধেক পদ শূন্য থাকায় পাঠদান কার্যক্রমেও চাপ তৈরি হয়েছে।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে নওগাঁ আধুনিক হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করে নওগাঁ মেডিকেল কলেজ। এরই মধ্যে প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এমবিবিএস সম্পন্ন করে ইন্টার্নশিপ শেষ করেছেন। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের দ্বিতীয় ব্যাচ বর্তমানে ইন্টার্নশিপ করছেন। এছাড়া তৃতীয় থেকে অষ্টম ব্যাচ পর্যন্ত মোট ৩৪৮ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন, যার মধ্যে ২১০ জন ছাত্রী।

প্রতিষ্ঠানটিতে অধ্যক্ষ, অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষক ও কিউরেটর মিলিয়ে মোট ৯০টি পদের অনুমোদন রয়েছে। তবে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৪৫ জন। এর মধ্যে একজন অধ্যক্ষ, তিনজন অধ্যাপক, নয়জন সহযোগী অধ্যাপক, ছয়জন সহকারী অধ্যাপক, ২৪ জন প্রভাষক এবং দুজন কিউরেটর রয়েছেন। কিউরেটরদের একজন বর্তমানে প্রেষণে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে কর্মরত।

শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক বিভাগে একই শিক্ষককে একাধিক ব্যাচ ও বিভাগের ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের একাডেমিক তদারকি এবং গবেষণামূলক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অবকাঠামোগত সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে এনাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, ফরেনসিক মেডিসিন, ফার্মাকোলজি, মাইক্রোবায়োলজি, প্যাথলজি, মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও কমিউনিটি মেডিসিনসহ ১১টি বিভাগ চালু থাকলেও শত শত শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র তিনটি শ্রেণিকক্ষ। পৃথক পরীক্ষার হল না থাকায় পরীক্ষার সময় শ্রেণিকক্ষগুলোই ব্যবহার করতে হয়। ফলে পরীক্ষা চলাকালে নিয়মিত পাঠদান বন্ধ রাখতে হয়, যা একাডেমিক ক্যালেন্ডার বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে।

শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, শিক্ষক ও চিকিৎসকরাও ভুগছেন কর্মপরিবেশের সংকটে। বিভাগীয় প্রধান ও কনসালট্যান্টদের জন্য পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকায় সীমিত পরিসরে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।

আবাসন সংকটও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্যাপ্ত আবাসিক সুবিধা না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে বাইরে বাসা ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে। বিশেষ করে ছাত্রীদের একটি অংশকে নিরাপত্তা শঙ্কার মধ্যেই ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান করতে হচ্ছে। এতে হাসপাতালভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও রাতের জরুরি একাডেমিক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ছে।

২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল হামজা বলেন, পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজগুলোতে রিডিং রুম, ক্যান্টিন, জিমনেসিয়াম, খেলার মাঠসহ নানা সুযোগ-সুবিধা থাকে। কিন্তু আমরা সেসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আধুনিক হাসপাতাল থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে একটি ভবনে অস্থায়ী হোস্টেলে থাকতে হয়। খেলাধুলা করতে চাইলে পাশের স্কুল-কলেজের মাঠে যেতে হয়। পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে তুলনা করলে হতাশা কাজ করে।

শিক্ষার্থী আনিসুর রহমান বলেন, একজন দক্ষ চিকিৎসক হওয়ার জন্য ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিজস্ব ক্যাম্পাস না থাকায় আমাদের নিজস্ব ওটি কমপ্লেক্স নেই। নওগাঁ আধুনিক হাসপাতালে আইসিইউও নেই। ফলে তাত্ত্বিক শিক্ষায় এগিয়ে থাকলেও ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতায় কিছুটা ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।

নওগাঁ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মুক্তার হোসেন বলেন, নিজস্ব ক্যাম্পাস না থাকায় আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। যে ভবনে কার্যক্রম চলছে, সেটি একটি মেডিকেল কলেজের জন্য পর্যাপ্ত নয়। পরীক্ষা নেওয়ার সময় ক্লাস বন্ধ রাখতে হয়। শিক্ষক ও কনসালট্যান্টদের বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। সব শিক্ষার্থীর জন্য আবাসিক সুবিধাও নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ছাত্রীদের একটি অংশকে নিরাপত্তা শঙ্কার মধ্যেই বাইরে থাকতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য আমরা বারবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। আশা করছি সরকার দ্রুত এ সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights