বিয়ের স্বপ্ন ভেঙে দিল এক মুহূর্তের দুর্ঘটনা!

অনলাইন ডেস্ক

আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরই বসার কথা ছিল বিয়ের আসর। ভবিষ্যৎ সংসার নিয়ে হাজারো স্বপ্ন বুনছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার তরুণ যুগল গ্যাভিন হিঙ্কলি ও ম্যাডেলিন ফক্স। বিয়ের প্রস্তুতি, কেনাকাটা আর নতুন জীবনের পরিকল্পনায় ব্যস্ত সময় কাটছিল তাদের। কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই সবকিছু ওলটপালট করে দেয়।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়ার বোমন্ট এলাকায় বিয়ের প্রয়োজনীয় কিছু কাজ সারতে বেরিয়েছিলেন ২১ বছর বয়সী গ্যাভিন ও তার বাগদত্তা ২০ বছর বয়সী ম্যাডেলিন। পথে দায়িত্ব পালনরত এক শেরিফ ডেপুটির দ্রুতগতির গাড়ি তাদের টেসলা গাড়িকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন গ্যাভিন। আর গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয় ম্যাডেলিনকে, যিনি এখনও দুর্ঘটনার ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি বয়ে বেড়াচ্ছেন।

ঘটনার প্রায় নয় মাস পর তদন্ত শেষে রিভারসাইড কাউন্টির শেরিফ অফিসের ডেপুটি গ্লিন উইলবার্নের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড এবং বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে গুরুতর আহত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। বর্তমানে তাকে প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, গুলির ঘটনার একটি কল পেয়ে উইলবার্ন জরুরি সাড়া দিতে যাচ্ছিলেন। তবে দুর্ঘটনার ঠিক আগে ডিসপ্যাচ থেকে জানানো হয়েছিল যে ঘটনাস্থলে ইতোমধ্যে পুলিশ পৌঁছে গেছে, সন্দেহভাজন গাড়িটি সরে গেছে এবং কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এরপরও তিনি সাইরেন ও জরুরি বাতি চালু রেখে ঘণ্টায় প্রায় ১০০ মাইল গতিতে গাড়ি চালিয়ে যান।

প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, একটি লাল সিগন্যাল অমান্য করে তিনি চৌরাস্তার মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং ঘণ্টায় প্রায় ৭১ মাইল গতিতে গ্যাভিন ও ম্যাডেলিনের গাড়িতে আঘাত করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘর্ষের কয়েক সেকেন্ড আগে তিনি গাড়ির গতি কমানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত দুর্ঘটনা এড়াতে পারেননি।

থেমে গেল একটি সম্ভাবনাময় ভালোবাসার গল্প

গ্যাভিন ও ম্যাডেলিনের পরিচয় ২০২২ সালে। বন্ধুত্ব থেকে ধীরে ধীরে ভালোবাসার সম্পর্কে জড়ান তারা। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুজনের সম্পর্ক ছিল গভীর আস্থা, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর দাঁড়িয়ে।

ম্যাডেলিনের ১৮তম জন্মদিনে একগুচ্ছ গোলাপ নিয়ে তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেন গ্যাভিন। সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় তাদের একসঙ্গে পথচলা। ঘোড়ায় চড়া, অফ-রোড ভ্রমণ, সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে যাওয়া কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো—সবখানেই তারা ছিলেন একে অপরের সঙ্গী।

পরিবারের সদস্যরা বলেন, গ্যাভিন এমন একজন মানুষ ছিলেন যিনি আশপাশের সবাইকে আপন করে নিতে পারতেন। তার স্বপ্ন ছিল ম্যাডেলিনকে নিয়ে একটি সুন্দর সংসার গড়ে তোলা। ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর তাদের বিয়ের দিনও নির্ধারিত ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তব হওয়ার আগেই কেড়ে নেয় নির্মম দুর্ঘটনা।

গ্যাভিনের বাবা-মা লরেন ও কোরি হিঙ্কলি এক বিবৃতিতে বলেন, “গ্যাভিন শুধু একজন ভুক্তভোগী নন, তিনি ছিলেন আমাদের ছেলে, একজন ভাই, বাগদত্ত, নাতি এবং অসংখ্য মানুষের প্রিয় বন্ধু। তার সামনে পুরো জীবন পড়ে ছিল। কিন্তু এক মুহূর্তে সব শেষ হয়ে গেছে। গ্যাভিনের আজও আমাদের মাঝে থাকার কথা ছিল।”

ন্যায়বিচারের লড়াই

দুর্ঘটনার পর শুধু ফৌজদারি মামলাই নয়, পৃথকভাবে দেওয়ানি মামলাও করেছে দুই পরিবার। মামলায় অভিযুক্ত ডেপুটি ছাড়াও রিভারসাইড কাউন্টি এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকটি স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা হয়েছে।

পরিবারগুলোর অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর জরুরি সেবাদানেও অবহেলা করা হয়েছে। তাদের দাবি, গুরুতর আহত গ্যাভিন ও ম্যাডেলিনের আগে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে চিকিৎসা ও হাসপাতালে নেওয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

ম্যাডেলিনের বাবা-মা বলেন, “এটি শুধু একটি দুর্ঘটনার মামলা নয়, এটি জবাবদিহিতার প্রশ্ন। গ্যাভিন ও ম্যাডেলিন তাদের স্বপ্নের জীবন গড়ে তোলার সুযোগ পাওয়ার কথা ছিল। সেই সুযোগ তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।”

এদিকে প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ডেপুটি সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে পারেন।

একটি সাধারণ দিনের কেনাকাটা যে একটি পরিবারের সব স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারে, গ্যাভিন ও ম্যাডেলিনের গল্প যেন তারই বেদনাদায়ক উদাহরণ। যে দিনটি ছিল নতুন জীবনের প্রস্তুতির অংশ, সেটিই হয়ে উঠল তাদের ভালোবাসার গল্পের সবচেয়ে করুণ অধ্যায়।

সূত্র : সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights