চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষা

আরাফাত মুন্না

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংস জঙ্গি হামলার এক দশক পূর্ণ হচ্ছে আজ। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাজধানীর গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াল সেই হামলায় নিহত হন ২০ জিম্মি ও দুই পুলিশ কর্মকর্তা। দেশবিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করা ওই হত্যাযজ্ঞের বিচার দুই ধাপ শেষ হলেও এখনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল এখন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায়। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, এটি শুধু বাংলাদেশের একটি আলোচিত হত্যা মামলা নয়, বিদেশি নাগরিক নিহত হওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবেও এর গুরুত্ব অনেক। তাই মামলাটির দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তিতে রাষ্ট্র সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে হামলা চালায় নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির পাঁচ সদস্য। দেশিবিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে চালানো ওই নৃশংস হত্যাযজ্ঞে প্রাণ হারান নয় ইতালীয়, সাত জাপানি, এক ভারতীয়, এক বাংলাদেশি-আমেরিকান দ্বৈত নাগরিক এবং দুই বাংলাদেশিসহ মোট ২০ জন। জঙ্গিদের ছোড়া গ্রেনেডে নিহত হন বনানী থানার তৎকালীন ওসি সালাউদ্দিন আহমেদ ও সহকারী পুলিশ কমিশনার রবিউল ইসলাম। পরদিন সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে নিহত হয় হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া পাঁচ জঙ্গি- মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পৃথক অভিযানে নব্য জেএমবির আরও আট সদস্য নিহত হন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুল হাসনাত রেজা করিমকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। দীর্ঘ বিচার শেষে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তারা হলেন- জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, আবদুস সবুর খান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাদিসুর রহমান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ এবং মামুনুর রশিদ। খালাস পান মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান। পরে ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর হাই কোর্ট মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে সাত আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। চলতি বছরের ১৭ জুন প্রকাশিত হয় পূর্ণাঙ্গ রায়। এরপর আসামিরা আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন। মামলাটি এখন চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মামলাটি আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তির যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এ মামলাতেও সেই উদ্যোগ থাকবে। তবে আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা কম এবং মামলার চাপ অনেক। তারপরও রাষ্ট্র বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।

তিনি বলেন, হোলি আর্টিজানের ঘটনা শুধু বাংলাদেশের নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে বহু বিদেশি নাগরিক নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

হোলি আর্টিজান বেকারিতে বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহতম জঙ্গি হামলার ঘটনাটি ঘটে ২০১৬ সালের ১ জুলাই। আট বছর আগের এ হামলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল, মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল নামের পাঁচ তরুণ জঙ্গি ঈদুল ফিতরের এক সপ্তাহ আগে পিস্তল, সাব মেশিনগান আর ধারালো অস্ত্র হাতে ঢুকে পড়েছিল হোলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয়। জবাই করে, গুলি চালিয়ে তারা ১৭ বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জনকে হত্যা করে। হামলা ঠেকাতে গিয়ে প্রাণ হারান দুই পুলিশ কর্মকর্তা। পরে সেখানে কমান্ডো অভিযান চালানো হয়।

আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামি হলেন- রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, হাদিসুর রহমান, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালেদ।

এদের মধ্যে আসলাম হোসেন ২০২৪ সালের ৬ জুন গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে কারারক্ষীদের গুলিতে নিহত হন। গণ অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন ওই কারাগারে কারারক্ষীদের জিম্মি করে ২০৯ জন বন্দি পালিয়ে যান। তখন কারারক্ষীদের গুলিতে মোট ছয়জন নিহত হন।

এ মামলার হাই কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় গত বছরের ১৭ জুন। পূর্ণাঙ্গ রায়ে প্রাসঙ্গিক বিবরণে বলা হয়, তদন্তকালে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ফরেনসিক, ব্যালিস্টিক, ডিএনএ ও ইমিগ্রেশন রিপোর্ট এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় জানা যায়, নিষিদ্ধঘোষিত জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নেতৃত্বে অতি উগ্র অংশ নব্য জেএমবি পরিচয়ে হোলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলা চালায়।

সেই হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া পাঁচজন সেনা কমান্ডোদের অভিযানে নিহত হন। তারা হলেন- রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল।

এদিকে হোলি আর্টিজানের সেই পুরোনো ঠিকানায় এখন আর আগের মতো কোনো রেস্তোরাঁ নেই। জায়গাটির মালিকপক্ষ পরবর্তী সময়ে রেস্তোরাঁটি আর চালু না করার সিদ্ধান্ত নেয়। বর্তমানে সেটি একটি আবাসিক ভবনে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে ভবনের দেয়ালের ভিতর আজও জমে থাকা স্মৃতি কেউ ভুলতে পারেননি। সেই রাতের ঘটনা শুধু নিহতদের নয়, গোটা জাতির স্মৃতিতে আজও স্পষ্ট হয়ে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights