ক্ষোভ নিয়েই ন্যাটো সম্মেলনের পথে ট্রাম্প, শঙ্কায় ইউরোপীয় মিত্ররা
অনলাইন ডেস্ক
ইউরোপে মোতায়েন মার্কিন সেনার সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে ন্যাটো মিত্রদের প্রতি কঠোর বার্তা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের একটি বৈঠকে তিনি এই ধারণা তুলে ধরেন বলে বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, চলতি বছরের বসন্তে হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করেন যে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ন্যাটোর অন্য সদস্য দেশগুলো অংশ নেয়নি। ওই বৈঠকেই তিনি জানতে চান, ইউরোপে মোতায়েন মার্কিন সেনা এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে দিলে তা মিত্র দেশগুলোর কাছে যথাযথ বার্তা পৌঁছে দেবে কি না।
এই আলোচনার অল্প সময়ের মধ্যেই পেন্টাগন ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক মোতায়েন কর্মসূচি হঠাৎ বাতিল করে এবং মহাদেশটি থেকে আরও কিছু মার্কিন সামরিক সদস্য প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়।
আরও বিপুল সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত দুই ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জুনে অনুষ্ঠিত ন্যাটো বৈঠকে আরও বড় পরিসরে সেনা কমানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করতে চেয়েছিলেন, যা ট্রাম্পের আলোচিত এক-তৃতীয়াংশ হ্রাসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারত। তবে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনার পর সেই পরিকল্পনা পরিবর্তন করা হয়।
এর পরিবর্তে হেগসেথ ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়ে ছয় মাসব্যাপী একটি পর্যালোচনার ঘোষণা দেন।
সে সময় তিনি সতর্ক করে বলেন, “এটি এমন একটি পর্যালোচনা, যেখানে কিছু দেশ ব্যর্থ হবে, আবার কিছু দেশ উজ্জ্বলভাবে উত্তীর্ণ হবে।”
ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্পের ক্ষোভ আরও তীব্র
তুরস্কে অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে যাওয়ার আগে ট্রাম্পের ক্ষোভ ও হুমকি ৭৭ বছর পুরোনো এই সামরিক জোটকে নতুন করে চাপে ফেলেছে।
ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্প বরাবরই প্রশ্ন তুলে আসছেন। গত এক বছরে তার এই অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। তার অভিযোগ, ইরানে যুদ্ধ শুরু করার পর যখন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রয়োজন ছিল, তখন দীর্ঘদিনের ইউরোপীয় মিত্ররা পাশে দাঁড়ায়নি।
তিনি কখনও প্রকাশ্যে ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি। বরং বারবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র একাই ইউরোপের নিরাপত্তার মূল ব্যয় বহন করছে।
এছাড়া ন্যাটোর সদস্য ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার ইচ্ছার কথাও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি তার তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তাদের আশঙ্কা, রাশিয়া ভবিষ্যতে ন্যাটো ভূখণ্ডে কোনও পদক্ষেপ নিয়ে জোটের ঐক্য পরীক্ষা করতে পারে।
এবার মিত্রদের দায়িত্ব নেওয়ার সময়
ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ম্যাথিউ হুইটেকার বলেন, “আঙ্কারার এই সম্মেলন আমাদের মিত্রদের জন্য নিজেদের দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত সময়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও সেটাই প্রত্যাশা করছেন।”
ইউরোপীয় নেতারা আশা করছেন, নতুন প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে ট্রাম্পের অসন্তোষ কিছুটা প্রশমিত করা সম্ভব হবে।
ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটেও সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির তথ্য তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, ট্রাম্পের চাপের ফলেই ইউরোপীয় দেশগুলো সামরিক ব্যয় বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।
তবে ব্যক্তিগত আলোচনায় অনেক ইউরোপীয় কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ট্রাম্পের বর্তমান মনোভাবের কারণে আঙ্কারা সম্মেলন নির্বিঘ্নে শেষ হবে কি না, তা নিয়ে তারা নিশ্চিত নন।
সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ
সম্মেলনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, “সম্পর্ক যদি একতরফাই থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এভাবে চলতে থাকা হাস্যকর। যখন আমাদের প্রয়োজন ছিল, তখন তারা আমাদের পাশে ছিল না।”
অন্যদিকে ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের বক্তব্য, ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর আগে তাদের সঙ্গে কোনও ধরনের পরামর্শ করা হয়নি। যদিও তারা হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ নৌ চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তবে মার্কিন প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের অভিযানে ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে ওয়াশিংটনের যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
আমার শুধু আনুগত্য চাই
হোয়াইট হাউসে মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকেও ট্রাম্প ন্যাটো মিত্রদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “আমি শুধু তাদের আনুগত্য চাই। আমাদের তাদের অর্থের দরকার নেই, অন্য কিছুরও দরকার নেই। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী আমাদেরই রয়েছে। আমি শুধু আনুগত্য চাই।”
রুটে তখন ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির একটি চার্ট দেখিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি এটিকে ‘ট্রাম্প ট্রিলিয়ন’ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, ইউরোপের ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে ট্রাম্পের চাপই মূল ভূমিকা রেখেছে।
ইউরোপে সেনা কমানোর বাস্তব প্রস্তুতি
গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ থেকে প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত সেনা প্রত্যাহার শুরু করেছে। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন।
চলতি বসন্তে পোল্যান্ডে নির্ধারিত সেনা রদবদল কর্মসূচি স্থগিত করার পাশাপাশি জার্মানি থেকে পাঁচ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তও বহাল রাখেন তিনি।
মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “সামরিক উপস্থিতি পুনর্মূল্যায়ন করা হবে- এটি কারও জন্য বিস্ময়ের বিষয় হওয়া উচিত নয়। সেই পর্যালোচনার ফলেই বাহিনীর অবস্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে।”
ইউরোপের উদ্বেগ, ইউক্রেনও আলোচনায়
ইউরোপীয় দেশগুলো এখন এমন এক ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যখন মহাদেশটির নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব আর যুক্তরাষ্ট্র বহন করবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের উচিত স্পষ্টভাবে জানানো- কোন সামরিক সক্ষমতা ইউরোপে থাকবে, কোনটি প্রত্যাহার করা হবে এবং কখন তা কার্যকর হবে। এতে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের সক্ষমতার ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা করতে পারবে।
এদিকে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমে গেলে রাশিয়া আরও উৎসাহিত হতে পারে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আঙ্কারায় ন্যাটো নেতাদের নৈশভোজে অংশ নেবেন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করবেন। তবে তিনি মূল শীর্ষ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন না, যা ন্যাটোতে ইউক্রেনের সদস্যপদ এখনও অনিশ্চিত থাকার ইঙ্গিত বহন করে।
সম্মেলনে ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনের জন্য কয়েক দশমিক বিলিয়ন ইউরো সামরিক সহায়তার নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা ট্রাম্পকে বোঝাতে চায় যে, ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিচালনার অর্থায়নে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবে এসব উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করতে এবং ন্যাটো সম্মেলনকে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট থেকে রক্ষা করতে পারবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সূত্র: সিএনএন
