এক দশকের দাবানলে ইউরোপজুড়ে শত শত মানুষের মৃত্যু

অনলাইন ডেস্ক

ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া দাবানলে গত এক দশকে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আগামী বছরগুলোতে এই মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে আশঙ্কার কথা জানিয়েছে বিজ্ঞানীরা। সবশেষ স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে ভয়াবহ দাবানলে অন্তত ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এটি দেশটির ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ দাবানলের ঘটনা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ বিশ্বের দ্রুততম উষ্ণ হতে থাকা মহাদেশ। ১৯৮০-র দশক থেকে এখানে বৈশ্বিক গড় হারের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে তাপমাত্রা বাড়ছে। বিশ্বজুড়ে রেকর্ড করা তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালটি ছিল তৃতীয় উষ্ণতম বছর এবং এ সময় ইউরোপজুড়ে বেশ কয়েকটি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যায়।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, পেট্রোল, তেল ও কয়লার মতো জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন তাপ ও ​​শুষ্কতার মাত্রা ও প্রকোপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যার ফলে নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল দাবানলের ঝুঁকিতে আরও বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। এখানে গত এক দশকে ইউরোপজুড়ে ঘটা কয়েকটি ভয়াবহ দাবানলের ঘটনা তুলে ধরা হলো:

২০১৮ সালে গ্রিসে ১০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু

গ্রিসের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলটি ঘটেছিল ২০১৮ সালে। ওই বছরে এথেন্সের পূর্বে অবস্থিত সমুদ্রতীরবর্তী শহর ‘মাটি’-তে এক বিশাল অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টারত মানুষজন তাদের বাড়িঘর ও রাস্তায় আটকা পড়েন। এতে ১০০ জনেরও বেশি মানুষ মারা যান; এদের মধ্যে কেউ কেউ আগুনের হাত থেকে বাঁচতে পানিতে নেমে সাঁতরে পালানোর চেষ্টাকালে ডুবে মারা যান।

২০২৩ সালে গ্রিসে দাবানলের ঘটনায় ২০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান। এর মধ্যে ১৮ জন অভিবাসী ছিলেন, যারা উত্তর-পূর্ব গ্রিসের একটি বনাঞ্চল দিয়ে যাওয়ার সময় আগুনের মধ্যে আটকা পড়েন। এটি ছিল ইউরোপের ইতিহাসে একক কোনো ঘটনায় ঘটা সবচেয়ে বড় দাবানল। গত সপ্তাহে উত্তর গ্রিসে একটি দাবানলে ১২ বছর বয়সী এক শিশু ও তার বাবার মৃত্যু হয়েছে।

গত বছর তুরস্কে দাবানলে ১০ জনের মৃত্যু

গত বছরের জুলাইয়ে তুরস্কের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় এসকিশেহির প্রদেশের একটি বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া দাবানল নেভানোর চেষ্টার সময় ১০ জন দমকলকর্মী ও উদ্ধারকর্মী প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে বন বিভাগের কর্মী এবং ‘আকুট’ নামক উদ্ধারকারী সংস্থার সদস্যরা ছিলেন।

দেশটির বনমন্ত্রী ইব্রাহিম ইউমাকলি ওই সময় জানিয়েছিলেন, হঠাৎ বাতাসের দিক পরিবর্তনের ফলে আগুনের শিখা সরে গিয়ে বনকর্মীদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছিল। নিহতদের মধ্যে ২৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তি ছিলেন, যিনি মাত্র দুদিন আগেই মধুচন্দ্রিমা শেষে কাজে ফিরেছিলেন। এছাড়া ‘আকুট’-এর এক স্বেচ্ছাসেবক ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানা ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধারের কাজে এক মাস অতিবাহিত করেছিলেন।

২০১৭ সালে পর্তুগালে দাবানলে বহু মানুষের মৃত্যু

২০১৭ সালে লিসবন থেকে ২০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত পেদ্রোগাও গ্রান্দে এলাকায় পর্তুগালের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলে ৬৬ জন মানুষ প্রাণ হারান। নিহতদের অধিকাংশই গাড়িতে করে সরে যাওয়ার সময় একটি নির্দিষ্ট সড়কে মারা যান।

বছরের শেষভাগে আরও কয়েকটি দাবানলের ঘটনায় পর্তুগালে দাবানলে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১২০-এর বেশি দাঁড়ায়, যা এ ধরনের ঘটনায় সর্বোচ্চ প্রাণহানির বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়। নিহতদের মধ্যে এক মাস বয়সী এক শিশু ও তার বাবা-মাও ছিলেন। এরপর পর্তুগিজ সরকার দাবানল প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

প্রাণঘাতী দাবানলের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করছে সাইপ্রাস

সাইপ্রাসে অনেক কর্মকর্তা সাম্প্রতিক দাবানলের তীব্রতা ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন। গত পাঁচ বছরে দেশটিতে দাবানলে অন্তত ছয়জন প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২১ সালের জুলাই মাসে আগুন-বিধ্বস্ত একটি পাহাড়ি গ্রামের বাইরে চারজন মিশরীয় শ্রমিকের দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটি এ পর্যন্ত যতগুলো দাবানলের সম্মুখীন হয়েছে, তার মধ্যে সেটিকে ‘সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক’ বলে অভিহিত করেছিলেন এক কর্মকর্তা।

গত জুলাই মাসে উদ্ধারকারী দলগুলো একটি পাহাড়ি রাস্তার পাশে সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়া গাড়ির ভেতর থেকে এক বয়স্ক দম্পতির মরদেহ উদ্ধার করে। বনভূমি ও পাহাড়ঘেরা প্রায় ৫০ বর্গমাইল এলাকা দাবানলে দ্রুত পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতি দেখে সাইপ্রাসের প্রেসিডেন্ট নিকোস ক্রিস্টোডৌলিডস মন্তব্য করেছিলেন, সাইপ্রাসে এর আগে এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি।

প্রবল বাতাস, অত্যধিক তাপমাত্রা এবং টানা তিনটি শীতকালে অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট অত্যন্ত শুষ্ক আবহাওয়া সব মিলিয়ে দাবানলটি যখন তীব্র আকার ধারণ করেছিল, তখন পরিস্থিতি এক চরম ও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

গত বছরের আগস্টে ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’-এর একটি গবেষণায় বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট তীব্র দাবদাহ ও বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় তুরস্ক, গ্রিস ও সাইপ্রাসে সংঘটিত বিশাল দাবানলগুলোকে আরও ভয়াবহ ও বিধ্বংসী করে তুলেছে।

সূত্র: এএফপি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights