মেসি আর মায়ামি ম্যাজিকে আমেরিকায় বেকহ্যাম রাজত্ব!

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো টেলিভিশন চ্যানেল চালু করলেই এখন মূলত তিন ধরনের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। প্রথমটি হরেক রকমের ফাস্ট ফুড বা মুখরোচক খাবারের, দ্বিতীয়টি নানা ভয়ানক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা পণ্যের, আর তৃতীয় প্রকারের বিজ্ঞাপনটি হলো কেবলই ডেভিড বেকহ্যামের।

চলতি ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালীন আমেরিকার আকাশ-বাতাস যেন এখন পুরোপুরি বেকহ্যামময়। মাঠে না নেমেও এই বিশ্বকাপ থেকে একক ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি আয় করতে চলেছেন ৫২ বছর বয়সী সাবেক এই ইংলিশ মিডফিল্ডার।

চলতি বিশ্বকাপের শেষভাগের রোমাঞ্চ যখন তুঙ্গে, তখন মাঠের বাইরে এক অনন্য রূপকথা লিখছেন বেকহ্যাম। এবারের টুর্নামেন্ট থেকে বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য চুক্তি বাবদ তাঁর সম্ভাব্য আয় প্রায় আড়াই কোটি মার্কিন ডলার ছুঁতে চলেছে। যুক্তরাজ্যের মানুষ হয়তো পুরোপুরি আঁচ করতে পারছে না যে, আমেরিকার বিনোদন ও বাণিজ্য অর্থনীতিতে বেকহ্যামের প্রভাব ঠিক কতটা সর্বগ্রাসী। পপ সম্রাট অ্যান্ডি ওয়ারহল একবার বলেছিলেন, ‘অর্থ উপার্জন করা একটি শিল্প।’ বেকহ্যাম যেন সেই শিল্পকেই বাস্তবে রূপ দিয়ে নিজেকে একটি আস্ত ‘বিজ্ঞাপন মেশিনে’ পরিণত করেছেন।

স্টেডিয়ামের বড় পর্দা থেকে শুরু করে টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন; সবখানেই তাঁর উপস্থিতি। কখনো তিনি চিপস খাচ্ছেন, কখনো গাড়ি চালাচ্ছেন, আবার কখনো কোনো দামি ঘড়ির বিজ্ঞাপনে স্মিত হাসছেন। ফোর্বস সাময়িকী তো সতর্ক করে বলেই দিয়েছে, বেকহ্যামের জনপ্রিয়তা এখন প্রায় অতি-সম্পৃক্ততার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

আমেরিকায় ব্রিটিশ তারকাদের সফল হওয়ার ইতিহাস নতুন নয়। তবে দ্য বিটলস-এর মতো গান গেয়ে বা জে কে রাউলিংয়ের মতো বই লিখে বেকহ্যাম আমেরিকায় রাজত্ব করছেন না। ফুটবলার হিসেবে তাঁর মাঠের দক্ষতা অনবদ্য হলেও আমেরিকাবাসী তাঁর সেই নিখুঁত ফ্রি-কিক বা কর্নারের জাদুকে মনে রাখেনি। তিনি সফল হয়েছেন স্রেফ ‘বিখ্যাত হওয়ার অসাধারণ যোগ্যতা’ দিয়ে।

সম্প্রতি লস অ্যাঞ্জেলেসে অভিনেতা টম ক্রুজের পাশে দাঁড়িয়ে হলিউড ওয়াক অব ফেম-এ নিজের তারকার উন্মোচন করেছেন তিনি। আমেরিকার হট্টগোল, রাজনৈতিক বিভাজন ও চিৎকার-চেঁচামেচিতে ভরা জনজীবনে বেকহ্যাম যেন এক শান্ত, মার্জিত ও নির্ভরতার প্রতীক। তিনি যেন আমেরিকার সেই কাঙ্ক্ষিত অভিভাবক, যার কাছ থেকে সবাই একটু প্রশংসা বা স্বীকৃতি চায়।

বেকহ্যামের এই আমেরিকান সাম্রাজ্য গড়ে ওঠার পেছনে কেবল গ্ল্যামার নয়, কাজ করেছে তাঁর সুদূরপ্রসারী ব্যবসায়িক বুদ্ধি। মার্কিন মুলুকে তাঁর শক্ত ভিত তৈরি হয়েছে ‘ইন্টার মিয়ামি’ ফ্র্যাঞ্চাইজির সহ-মালিকানা অর্জনের মধ্য দিয়ে। আর এই যাত্রায় তাঁর চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছেন কিউবান-আমেরিকান ধনকুবের মাস ভ্রাতৃদ্বয়—হোর্হে ও হোসে মাস সান্তোস। তাঁদের বাবা হোর্হে মাস সিনিয়র ছিলেন কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো বিরোধী আন্দোলনের এক প্রভাবশালী, সশস্ত্র ও আপসহীন ব্যক্তিত্ব। মিয়ামির রাজনীতি ও প্রশাসনে অত্যন্ত ক্ষমতাধর এই মাস পরিবারের হাত ধরেই ফুটবলকে ব্যবসার এক মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত করেছেন বেকহ্যাম। বর্তমানে ইন্টার মিয়ামি ক্লাবের বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি মার্কিন ডলারে, যার নতুন স্টেডিয়াম ‘ফ্রিডম পার্ক এরিনা’ এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়।

তবে বেকহ্যামের এই বাণিজ্যিক সাফল্যের আগুনে সবশেষ ও সবচেয়ে বড় জ্বালানিটি পড়েছে ২০২৩ সালে, যখন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি ইন্টার মিয়ামিতে যোগ দেন। ২০২৮ সাল পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ মেসির আগমন বেকহ্যামের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যকে এক ধাক্কায় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মিয়ামির উইনউড এলাকায় মেসির বিশাল এক ম্যুরাল এখন পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ, যার একটি অংশ বেকহ্যাম নিজে ক্রেনে চড়ে রঙ করেছিলেন। মেসির জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে ইন্টার মিয়ামির জার্সি এখন বিশ্বের চতুর্থ সর্বোচ্চ বিক্রিত ফুটবল জার্সিতে পরিণত হয়েছে।

চলতি বিশ্বকাপে মিয়ামিতে যখন ইংল্যান্ড ও নরওয়ের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তখন নেপথ্যের আসল নায়ক হিসেবে আলো কেড়ে নিচ্ছেন বেকহ্যামই। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে একটু একটু করে গড়ে তোলা তাঁর নিজস্ব ব্র্যান্ড আজ সফলতার চূড়ায়।

দ্য গার্ডিয়ান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights