আজিমপুর কবরস্থান ঘিরে কঙ্কালের গোপন বাণিজ্য ঘাসের বস্তায় ভরে পাচার

অনলাইন ডেস্ক

ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে বাবার কবর জিয়ারত করতে এসেছিলেন রাশেদ (ছদ্মনাম)। প্রায় আট মাস আগে বাবাকে এখানেই দাফন করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। সেদিন কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তার মনে হয়েছিল, মাটির নিচে নিশ্চিন্তেই ঘুমিয়ে আছেন বাবা। কিন্তু কয়েক দিন পর লোকমুখে শুনতে পান, রাতের আঁধারে সেখানে মরদেহ বেচাকেনা হয়। কথাটি প্রথমে গুজব বলে উড়িয়ে দিলেও পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, কবরস্থানকে ঘিরে সক্রিয় রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ কঙ্কাল পাচারকারী চক্র। সে মুহূর্তে রাশেদের মনে প্রশ্ন জাগে—‘আমার বাবার কবর কি নিরাপদ?’ এ প্রশ্ন কেবল রাশেদের নয়; আজিমপুর কবরস্থানে প্রিয়জনকে শায়িত রেখে আসা হাজারো পরিবারের।

রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ আজিমপুর কবরস্থানে প্রতিদিন গড়ে ২৫-৩০টি মরদেহ দাফন করা হয়। প্রায় ৩২ একরজুড়ে বিস্তৃত এ সমাধিস্থলে রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কবর। কিন্তু স্বজনদের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত এ স্থানকে ঘিরেই দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে কঙ্কাল পাচারের একটি সংঘবদ্ধ চক্র, যার প্রমাণ মিলেছে অনুসন্ধানেও। গোপনে পরিচালিত এ নেটওয়ার্কে জড়িত রয়েছেন কয়েকজন গোরখোদক ও তাদের সহযোগীরাও। তারা নির্দিষ্ট কবর চিহ্নিত করে রাখেন এবং সুযোগমতো মরদেহ অন্যত্র সরিয়ে নেন। পরে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী কঙ্কাল বা হাড় সরবরাহ করে থাকেন তারা। পুরো প্রক্রিয়াটিই সম্পন্ন হয় মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে।

মেডিকেল শিক্ষার্থী পরিচয়ে কঙ্কাল ক্রেতা হিসেবে অনুসন্ধানে চক্রের অন্যতম সমন্বয়কারী হিসেবে বয়স চল্লিশের যুবক হিমেলের নাম উঠে আসে। তার সহযোগী হিসেবে পরিচয় দেয়া আল-আমিন জানান, হিমেল দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এ কাজে যুক্ত। নেশার অর্থ জোগাড় করতেই তিনি মূলত এ কাজে জড়িয়েছেন বলে দাবি তার সহযোগীর। হিমেল সম্পর্কে এর বেশি আর বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি তিনি।

গোপন আলাপচারিতায় আল-আমিন বলেন, ‘বেওয়ারিশ বা পরিচয়বিহীন কবর থেকে মরদেহ সংগ্রহ করা তুলনামূলক সহজ। ছয় থেকে সাত মাস পুরনো, নামফলকবিহীন কবরগুলোকেই মূলত টার্গেট করা হয়। প্রয়োজনে সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে কঙ্কাল সংগ্রহ করে দেয়া সম্ভব।’

চক্রের এ সদস্য নিজের পরিচয় গোপন না করেই কঙ্কাল সরবরাহের প্রস্তাব দেন। একটি মানুষের দেহে যে ২০৬টি হাড় থাকে, সব গুনে গুনে সরবরাহ করা হবে বলেও জানান। এর জন্য চাওয়া হয় ৪০ হাজার টাকা। আল-আমিন বলেন, ‘যারা কবর খোঁড়ে, তারাই কাজটা করে দেবেন। আপনি চাইলে আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেব। খরচাপানি দিলে সাত-দশ দিনের মধ্যেই ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’

তাদের কার্যপদ্ধতিও বেশ সুসংগঠিত। সন্ধ্যার পর সুবিধাজনক সময়ে কবর খুঁড়ে হাড় বের করে ঘাসের বস্তায় ভরে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেয়া হয়। পুরো যোগাযোগ চলে মোবাইল ফোনে। লেনদেন শেষ হওয়ার পর ‘একপক্ষ আরেক পক্ষকে চেনে না’—এমন ব্যবস্থাই অনুসরণ করা হয়।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, কবরের অবস্থান অনুযায়ী কঙ্কাল বা মরদেহের দর নির্ধারণ করা হয়। কবর খুঁজে বের করতেই নেয়া হয় ৩-৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। ভেতরের অংশের কবর হলে তুলনামূলক কম দামে ‘ম্যানেজ’ করা যায় বলে দাবি করেন চক্রের সদস্যরা।

কবরস্থানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুললে চক্রের এক সদস্য বলেন, ‘কোথায় কোথায় সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে, তা তাদের জানা।’ ফলে নজরদারি এড়িয়ে কাজ করতে কোনো সমস্যা হয় না বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে আল-আমিনের মাধ্যমে চক্রের সমন্বয়কারী হিমেলের সঙ্গে যোগাযোগ হলে তিনি জানান, একটি মরদেহ থেকে সব হাড় পাওয়া যায় না। তাই দুই বা তিনটি মরদেহ থেকে হাড় সংগ্রহ করে পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল তৈরি করতে হয়। সে বিষয়ে কথা না এগিয়ে হিমেল সরাসরি দরদামে চলে যান। অনুসন্ধান টিমের এক সদস্যকে তিনি বলেন, ‘আপনার মতো অনেক মেডিকেলের শিক্ষার্থী আমাদের কাছে আসে। আগে অনেককেই কঙ্কাল দিয়েছি। একজন ৪২ হাজার টাকা দিয়েছিল। আপনার কাছ থেকে ৪০ হাজার নেব। চাইলে ২০৬টা হাড় গুনে গুনে দিতে পারব। আর এ কাজের জন্য আমরা যে টাকা নিই, তার একটা অংশ এতিমখানায় দান করি। না হলে তো এ টাকা হালাল হবে না!’

আজিমপুর কবরস্থানে কবর খনন ও দাফনের কাজে সিটি করপোরেশন এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুই শিফটে ৮০ জনের বেশি কর্মী দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তাদেরই এক গোরখোদক কঙ্কাল বাণিজ্যের কথা স্বীকার করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, প্রতিদিনের দাফনের মধ্যে কিছু কবর আগে থেকেই নজরদারিতে রাখা হয়। নির্দিষ্ট সময় পর মরদেহ অন্য একটি কবরে সরিয়ে রেখে পরে সুবিধাজনক সময়ে কঙ্কাল সংগ্রহ করা হয়।

এদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, কঙ্কাল চুরির অভিযোগ নতুন নয়। লালবাগ থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিযোগ শোনা গেলেও কখনো এ-সংক্রান্ত কোনো সাধারণ ডায়েরি বা লিখিত অভিযোগ থানায় জমা পড়েনি। ফলে আনুষ্ঠানিক তদন্তও করা সম্ভব হয়নি। তবে অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়াছিন আলী বলেন, ‘কঙ্কাল পাচারের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পেলে আমরা তা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’ একই কথা জানিয়েছেন লালবাগ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান।’

সৌজন্যে বণিক বার্তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights