ভালো নেই রাঙামাটির সীমান্তের বানভাসিরা

রাঙামাটি প্রতিনিধি
ভালো নেই রাঙামাটির সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকার বানভাসি মানুষ। একদিকে পাহাড়ি দুর্গমতা, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন। নেই কার্যকর সড়ক যোগাযোগও। উজানের ঢল ও পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে নৌপথেও যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ফলে সীমান্তঘেঁষা বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের হাজারো মানুষের খোঁজও ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না প্রশাসন কিংবা স্বজনদের কাছে।

টানা আট দিন ধরে অনেক মানুষ একই ভেজা কাপড় পরে দিন কাটাচ্ছেন। শুকনো কাপড় নেই, নেই নিরাপদ আশ্রয়ও। বানের পানিতে তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্বল। অনেক পরিবার ঘরের মাচার ওপর আশ্রয় নিয়ে কোনো রকমে দিন-রাত পার করছে। এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে রয়েছে ফারুয়া ইউনিয়নের প্রায় ১৬ হাজার মানুষ।

রাঙামাটি জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিলাইছড়ি উপজেলায় বর্তমানে চারটি আশ্রয়কেন্দ্র চালু রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ২৫ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে ফারুয়া ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামের মানুষের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো প্রশাসনের কাছে নেই।

জানা গেছে, রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার দুর্গম ৩ নম্বর ফারুয়া ইউনিয়ন রাইংখ্যং খালের তীরে অবস্থিত। ইউনিয়নটিতে বাঙালি ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রায় ১৬ হাজার মানুষের বসবাস। যমুনাছড়ি, বমপাড়া, তক্তানালা, একুজ্জ্যাছড়ি, ওরাছড়ি, উলুছড়ি, তারাছড়ি ও গোয়াইনছড়িসহ অন্তত ১৫টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়েছে। ভারতের মিজোরাম ও মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা এই এলাকায় বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কের সংকট আগে থেকেই ছিল। বন্যার কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, কৃষিজমি ও গবাদিপশুর খামার। পানিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে কৃষকদের গোলাভরা ধানসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী।

স্থানীয় বাসিন্দা সুধারত্ত তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, বন্যার পানি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে অনেকের ঘরবাড়ি ভেঙে ভেসে গেছে। কেউ কেউ শুধু গায়ের কাপড় নিয়ে প্রাণ বাঁচিয়ে বের হতে পেরেছেন। এখানকার অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র। বাঁশের ঘরই ছিল তাদের একমাত্র আশ্রয়। এখন মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। খাবারের পাশাপাশি নারী ও শিশুদের জন্য কাপড়ের সংকটও তীব্র।

ফারুয়ার পাংখোয়া পাড়ার বাসিন্দা গ্যাব্রিয়েল পাংখোয়া বলেন, ২০২৩ সালের বন্যার চেয়েও এবারের পরিস্থিতি ভয়াবহ। হঠাৎ করেই পানির স্রোত এত বেড়ে যায় যে সবাই প্রাণ বাঁচাতে ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। মুহূর্তেই নদী যেন সমুদ্রে পরিণত হয়। বিদ্যুৎ নেই, মোবাইল নেটওয়ার্কও খুব দুর্বল। ফলে বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।

বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেন বলেন, ফারুয়া উচ্চবিদ্যালয় ও ইউনিয়ন পরিষদে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষের জন্য তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হচ্ছে।

রাঙামাটির সিভিল সার্জন ডা. নূয়েন খীসা বলেন, ফারুয়া ইউনিয়নে বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। তবে প্রবল স্রোতের কারণে এখনো সেখানে মেডিকেল টিম পাঠানো সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী এবং নারীদের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছে দেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights