সোশ্যাল মিডিয়া চাঁদাবাজের কবলে পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

পুলিশের কোনো কর্মকর্তার নাম বদলি বা পদোন্নতির তালিকায় এলেই তৎপর হয়ে ওঠে একটি চাঁদাবাজ চক্র। কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বানোয়াট তথ্য দিয়ে তৈরি হয় ‘ডসিয়ার’, এরপর দেশের বাইরে থাকা কিছু ফেসবুকভিত্তিক অ্যাকটিভিস্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে জনমত তৈরির চেষ্টা করা হয়। উদ্দেশ্য একটাই- কর্মকর্তাকে মানসিক চাপে ফেলে টাকা আদায় করা। টাকা না দিলে শুরু হয় বদলি বা পদোন্নতি ঠেকিয়ে দেওয়া। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বাহিনীর ভিতরে অবিশ্বাস ও বিভক্তি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এক কর্মকর্তা আরেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফেসবুকে অপপ্রচার চালিয়ে ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রবণতাও বেড়েছে। প্রশাসনিক তদন্তের চেয়ে এখন ফেসবুককেই বেশি ভয় পান তাঁরা।

জানা যায়, যখনই পুলিশের কোনো কর্মকর্তাকে জেলায় কিংবা ভালো কোনো ইউনিটে পদায়ন করা হয়, তখনই সোশ্যাল মিডিয়া চাঁদাবাজরা বিভিন্নভাবে তাঁদের কাছ থেকে টাকা দাবি করেন। সেই টাকা দিতে অস্বীকার করলে শুরু হয় অপপ্রচার ও ব্ল্যাকমেলিং। এতে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তারা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বাড়ছে হতাশাও। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরের ট্রমা এখনো পুলিশ পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি, এরই মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রমা শুরু হয়েছে। তবে কেউ কেউ বলছেন, সমাজমাধ্যমে পুলিশের কোনো কর্মকর্তা সম্পর্কে কোনো কিছু পোস্ট করা হলেই তাৎক্ষণিক তাকে শাস্তির মুখে ফেলে দেন ঊর্ধ্বতনরা। তদন্ত ও তথ্য যাচাই ছাড়াই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এমন পদক্ষেপে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মাঠের সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তারা। আর যখন যাচাই ছাড়াই ঊর্ধ্বতনরা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেন, তখন সন্দেহ বেড়ে যায় যে অসদুদ্দেশ্যে সমাজমাধ্যমে পোস্টের পেছনে তাঁদেরও হাত থাকতে পারে। পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্রের দাবি, বদলি-পদোন্নতির গোপন তথ্য বাহিনীর ভিতর থেকেই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে, আর সেই তথ্য ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো হয়। সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, ‘সমাজমাধ্যমের অপপ্রচার বন্ধের উপায় হলো পুলিশের সব ধরনের আকামকুকাম বন্ধ করা। আর নিজের কাজটি যথাযথভাবে করে যাওয়া।’ জানা যায়, সম্প্রতি পুলিশের ২৪ ব্যাচের কর্মকর্তা রায়হান উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ফেসবুকে পোস্ট ছড়ানো হয়, যদিও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পদোন্নতিবঞ্চিত থাকার পরও তিনি পেশাদারি থেকে বিচ্যুত হননি বলে জানান সহকর্মীরা। একইভাবে ঝালকাঠিতে পুলিশ সুপার পদে পদায়নের পর ২৮ ব্যাচের কর্মকর্তা বদরুল আলম মোল্লার বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে পদায়নের অভিযোগে একটি এআই-নির্মিত অডিও ফাঁস করা হয়, যার সত্যতা প্রমাণিত হয়নি। অথচ এ অডিওর জেরে তাঁকে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে দেওয়া হয়নি। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সমাজমাধ্যমনির্ভর এই চাপের কারণে মাদকবিরোধী অভিযান এবং গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্তেও ধীরগতি দেখা দিচ্ছে, ঝুঁকি নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন অনেকে। পুলিশ সদর দপ্তরের সাইবার-সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে তথ্য পাচারকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights