অ্যামোনিয়া গ্যাস লিকেজে শেরপুরে ৫৭ হাজার বস্তা আলু নষ্ট

শেরপুর প্রতিনিধি
শেরপুরের একমাত্র বেসরকারি তাজ হিমাগারে (কোল্ড স্টোরেজ) অ্যামোনিয়া গ্যাস লিকেজের ঘটনায় অন্তত ৫৭ হাজার বস্তা বীজ ও খাবার আলু পচে নষ্ট হয়েছে। এতে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি আসন্ন আলু চাষ মৌসুমে বীজের সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন শত শত কৃষক।

জেলা প্রশাসন ও কোল্ড স্টোরেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে দ্রুত বৈঠক করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং গ্রহণযোগ্য সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে শেরপুর জেলায় ৫ হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ১ লাখ ৯০০ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়। মৌসুমের শুরুতে বাজারে দাম কম থাকায় বেশি লাভের আশায় এবং পরবর্তী মৌসুমে বীজ হিসেবে ব্যবহারের জন্য কৃষকরা প্রতিবছর কোল্ড স্টোরেজে আলু সংরক্ষণ করেন।

জেলায় সরকারি দুটি বীজ আলুর হিমাগারে মাত্র ৩ হাজার মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। ফলে কৃষকদের প্রধান ভরসা বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত একমাত্র বেসরকারি তাজ কোল্ড স্টোরেজ। প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন বা ১ লাখ ৭৩ হাজার বস্তা ধারণক্ষমতার এই হিমাগারে বস্তাপ্রতি ৩৩০ টাকায় নভেম্বর পর্যন্ত বীজ ও খাবার আলু সংরক্ষণ করা যায়। শেরপুর ছাড়াও আশপাশের জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকেও এখানে আলু রাখা হয়।

গত ১৪ জুলাই কোল্ড স্টোরেজটির রেফ্রিজারেশন ইউনিটের একটি পাইপ ফেটে বিষাক্ত অ্যামোনিয়া গ্যাস লিক হতে শুরু করে। প্রথমে স্টোরেজের ফোরম্যান আব্দুল মান্নান ও তাঁর সহকারীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। পরে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হলে তাদের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে গ্যাস লিকেজ নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে ততক্ষণে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ায় স্টোরেজের তিনটি চেম্বারের মধ্যে দুই নম্বর চেম্বারে সংরক্ষিত প্রায় ৫৭ হাজার বস্তা, অর্থাৎ প্রায় ৩ হাজার ১০০ মেট্রিক টন আলু পচে যায়।

ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে রবিবার (১৯ জুলাই) দুপুরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা হিমাগারে এসে বিক্ষোভ করেন। বীজ আলু নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আগামী মৌসুমে কীভাবে আবাদ করবেন, তা নিয়ে তারা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় রবিবার রাতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে হিমাগার কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আলুচাষিদের ক্ষতি, হিমাগার কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এবং পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করা হয়। পরীক্ষার ফল না পাওয়া পর্যন্ত পচে যাওয়া আলু বাজারজাত বা খাদ্য হিসেবে ব্যবহার না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সদর উপজেলার হেরুয়া গ্রামের কৃষক সুলতান মিয়া বলেন, আগামী মৌসুমে চাষাবাদের জন্য তিনি ৫১ বস্তা বীজ আলু সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু গ্যাস লিকেজে সব আলু নষ্ট হয়ে গেছে। টাকা খরচ করে হিমাগারে রাখার পরও আলু নষ্ট হওয়ায় তিনি এখন চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

একই অবস্থা পার্শ্ববর্তী লতারিয়া গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন, আব্দুস সালাম, আনোয়ার হোসেনসহ আরও অনেকের। অন্যদিকে স্থানীয় আলু ব্যবসায়ী আব্দুল গণি জানান, তাঁর ১ হাজার ৬৪০ বস্তা দেশি আলু সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে তাঁর লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পুরো হিসাব করার সাহসও পাচ্ছেন না বলে জানান তিনি।

কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনাবশত পাইপ ফেটে অ্যামোনিয়া গ্যাস লিক হওয়ায় ৫৭ হাজার বস্তা আলু নষ্ট হয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার কৃষক, মজুতদার ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এদিকে নষ্ট আলু বাজারে গিয়ে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে—এমন আশঙ্কায় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আলুর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। পরীক্ষার ফল এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াছমিন বলেন, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। আলুচাষিদের স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। দ্রুত একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights