মেসির সঙ্গে কেঁদেছে ঢাকা

ক্রীড়া প্রতিবেদক

ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল উন্মাদনায় রীতিমতো উড়ছিলেন বাংলাদেশের আর্জেন্টাইন ভক্তরা। মেসির হাতে দ্বিতীয় সোনালি ট্রফির স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। কিন্তু ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজতেই স্প্যানিশদের উল্লাসের উল্টো পিঠে মেটলাইফ স্টেডিয়াম ঢেকে গেল বিষাদের কালো চাদরে। কাছে এসেও ছোঁয়া হলো না সোনালি ট্রফিটা, ভেঙে গেল লাতিন স্বপ্নের মিনার। আর সেই স্বপ্নভঙ্গের পর্বতসম কষ্টে যখন কান্না ধরে রাখতে পারলেন না লিওনেল মেসি, তখন কোটি ভক্তের হৃদয়ে নেমে এলো এক শ্রাবণের রাত। স্তব্ধ হয়ে গেল উন্মাদনায় উড়তে থাকা ঢাকা শহর। থেমে গেল সমর্থকদের উচ্ছ্বাস। রাত শেষে ভোর হতে চলল তবুও যেন ঢাকার রাস্তায় থামছে না বেদনার সুর। সকাল পর্যন্ত গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিতে বাইরেই নিজেদের হৃদয়ক্ষত ভিজালেন মেসিভক্তরা। শুধু ঢাকাই নয়, মেটলাইফের বড়পর্দায় ফুঁপিয়ে কাঁদা বিশ্বজয়ী অধিনায়কের অশ্রুসিক্ত মুখটা ভেসে উঠতেই স্তব্ধ হয়ে যায় নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার থেকে বুয়েন্স আইরেসের গলি। মেটলাইফ থেকে ঢাকা-কান্নার কোনো মহাদেশীয় সীমানা থাকে না, ফুটবলের আবেগ তা আবার প্রমাণ করল। বিশ্বকাপের ট্রফি ধরে রাখার এই লড়াইয়ে স্পেনের ১-০ গোলের জয় যখন ইতিহাস লিখছিল, তখন ঢাকা শহরের খোলা মাঠ কিংবা রাস্তার পাশে চুপসে বসে থাকা তরুণদের চোখে ছিল শুধুই অবিশ্বাস। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন মেসিভক্তরা, যেন নিজের কোনো পরম আত্মিকের বিচ্ছেদবেদনা। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে বহু দূরবর্তী এক দেশের পরাজয়ে ঢাকার অলিগলিতে নেমে আসা এমন নীরবতা ফুটবল-প্রেমেরই এক অলৌকিক বহির্প্রকাশ। প্রিয় দল আর্জেন্টিনার ফাইনাল ম্যাচ নিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ সব বিভাগীয় শহরে ছিল আনন্দের মাতম। সকাল থেকে পর্দায় খেলা দেখানোর প্রস্তুতি নেন মেসি ভক্তরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, মহসীন হল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চ, বটতলা, বনানী মাঠ, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়, মিরপুর স্টেডিয়াম, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ শহর, জেলাগুলোতে বড় পর্দায় খেলা দেখানো হয়। ঢাকার গুলশান আড়ংয়ের পার্কিং, ঢাকা সিটি ক্লাব মাঠসহ বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ছিল ফাইনাল ম্যাচ দেখার উন্মাদনা। বসুন্ধরার এক শ ফিটে ৫৬০ ইঞ্চি পর্দায় ফাইনাল ম্যাচ দেখার আয়োজন করা হয়। হাজার হাজার তরুণ-তরুণী উপভোগ করেন এ ম্যাচ। আসরজুড়ে যে পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হয়েছিল পুরো বিশ্ব-আটটি গোল, চারটি অ্যাসিস্ট আর ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বমঞ্চ হ্যাটট্রিক, সেই মহাজাগতিক রাজপুত্রের ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ অধ্যায়টি সমাপ্ত হলো এক করুণ ট্র্যাজেডিতে। ২০২৮-এর কোপা কিংবা চার বছর পরের বিশ্বকাপের ক্যালেন্ডার যখন শুধুই দূরবর্তী সংখ্যা, তখন ফুটবলের রাজপুত্রের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া প্রতিটি ফোঁটা অশ্রুর সঙ্গে সুর মিলিয়ে কেঁদেছে গোটা ঢাকা। রাজপুত্রের বিষাদময় বিদায়ের করুণ সুর ধ্বনিত হয়েছে দূর বাংলাদেশের বুকেও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights