বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা নিয়ে নয়া টানাপোড়েন

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রতিটি ফিফা বিশ্বকাপই ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশকে উৎসবের এক মিলনমেলায় পরিণত করে। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেন বা জার্মানির পতাকায় ভরে ওঠে দেশের সড়ক ও অলিগলি। এসব পতাকা কখনোই রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রতীক ছিল না। প্রিয় ফুটবল দলের পতাকা টানানো ছিল খেলার প্রতি ভালোবাসা যা শ্রেণি, ধর্ম ও মতাদর্শের বিভেদ পেরিয়ে দেশের সকল মানুষকে এক করেছে।

তবে এবারের বিশ্বকাপে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন ছিল। অনেক জায়গায় ফুটবল দলের পতাকার বদলে দেখা গেছে ধর্মীয় পতাকা। দেশের কিছু এলাকায় সংগঠিতভাবে ফুটবলের বিরুদ্ধে বিশেষ করে মেয়েদের ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে প্রচারণাও চালানো হয়েছে। আলাদাভাবে দেখলে এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে। কিন্তু সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে। আর সেটি হল বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক পরিচয় কি ক্রমেই আরও বেশি চাপে পড়ছে?

দেশে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। ধর্ম ও জাতীয়তাবাদ ক্রমেই জনগণের আলোচনায় বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে।

ভারতবিরোধী বক্তব্যও এখন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ভারতের নীতির সমালোচনা গণতান্ত্রিক বিতর্কের স্বাভাবিক অংশ। তবে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপক ভারতবিরোধী প্রচারণা বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের প্রতিও বিরূপ মনোভাব তৈরি করেছে। একটি মহল বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ‘হিন্দুয়ানী’ হিসেবে তুলে ধরছে এবং মুসলিম পরিচয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে প্রচার করছে। এ ধরনের বয়ান সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক সংস্কৃতিকেও দুর্বল করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পহেলা বৈশাখসহ বড় জাতীয় উৎসব এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে মূল উদ্বেগ অন্য জায়গায়। সমালোচকদের মতে সরকারি আয়োজন হলেও বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক পরিসরকে ভয়ভীতি, ভাঙচুর এবং ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আদর্শিক প্রচারণা থেকে রক্ষায় রাষ্ট্রকে যথেষ্ট কার্যকর মনে হয়নি।

এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির নানা প্রতীকের ওপর হামলার ঘটনায়। অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ, ম্যুরাল, জাদুঘর এবং দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ ভাঙচুর ও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু স্থাপনা ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমালোচকদের মতে এগুলো একটি জাতির ঐতিহাসিক স্মৃতির ওপর এমন আঘাত, যে জাতি অসীম ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে।
এই চাপ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও পড়েছে। ছায়ানট ও উদীচী বাংলা গান, সাহিত্য এবং প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক চর্চাকে দীর্ঘদিন ধরে এগিয়ে নেওয়া দু’টি সংগঠন। অতীতেও প্রতিষ্ঠান দুইটি উগ্রপন্থিদের হামলার শিকার হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও এদের বিরুদ্ধে ভাঙচুর, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং তাদের কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ধারাবাহিক প্রচারণার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনা শিল্প—সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা আবারও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক চর্চার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এদিকে, জনজীবনে নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত করার বারবার চেষ্টা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। মেয়েদের ফুটবল টুর্নামেন্টের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রচারণা এবং নারীদের পোশাক ও আচরণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি ও সমালোচনামূলক প্রচার আরও রক্ষণশীল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করেন সমালোচকরা। অন্যদিকে, সুফি দরগাহ এবং লোকজ ধর্মীয় ঐতিহ্যের ওপর হামলার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব ধারাই বাংলাদেশের সহনশীলতা, অন্তর্ভুক্তি এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চেতনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে।

এসব ঘটনার মানে এই নয় যে বাংলাদেশ তার ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তি থেকে সরে যাচ্ছে। তবে এসব ঘটনা পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়। এই বিষয়গুলো দেখবাল করার দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়। রাজনৈতিক দল, বিশ্ববিদ্যালয়, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজ-সবারই দেশের বহুত্ববাদী ঐতিহ্য রক্ষায় ভূমিকা পালন করতে হবে।
ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষাকে কখনোই একটি রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করা বা অন্য একটি দলের বিরোধিতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি মূলত সেই সাংবিধানিক মূল্যবোধ রক্ষার বিষয় যার ভিত্তিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

১৯৭১ সালে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ এবং সমান নাগরিক অধিকারের আদর্শকে ভিত্তি করে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। এই আদর্শগুলো এখনো দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে লড়াই এখন আর যুদ্ধক্ষেত্রে নয়। এই লড়াই চলছে শ্রেণিকক্ষে, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে, জনপরিসরে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে।

বাংলাদেশ যদি বিভাজন ও অসহিষ্ণুতার হাত থেকে তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে শুধু স্মৃতিস্তম্ভ বা ঐতিহ্যই নয়, বরং স্বাধীনতার ভিত্তি গড়ে দেওয়া অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয়ও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights