‘ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ আমাদের জন্যই ভালো, তবে আমরা জড়াব না’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে শুরু হওয়া যুদ্ধকে ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে আদর্শ ফলাফল বলে বর্ণনা করেছেন দেশটির কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ। তবে তার মতে, শর্ত একটাই—ইসরায়েলিদের নিজেদের এই যুদ্ধে অংশ নেওয়া চলবে না।

মঙ্গলবার ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম কান নিউজের এক প্রতিবেদনে স্মোট্রিচের এই মন্তব্য প্রকাশ করা হয়। তিনি বলেন, এই অভিযানে যোগ দেওয়ার কোনো ইচ্ছে ইসরায়েলের নেই—বর্তমান পরিস্থিতিই আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো।

গাজায় অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপন ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আয়োজিত বার্ষিক সমাবেশ ‘কাতিফ কনফারেন্স ফর ন্যাশনাল রেসপনসিবিলিটি’-তে তিনি এসব কথা বলেন।

স্মোট্রিচ এর আগে একাধিকবার গাজা দখল, সেখানে সামরিক শাসন জারি এবং ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নিধনের পাশাপাশি নতুন করে বসতি স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমন্বিতভাবে ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা করে। মূলত ওয়াশিংটনকে প্ররোচিত করেই ইসরায়েল এই সংঘাতে টেনে আনে, যার জেরে তেহরানও ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়। চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে এবং ইরান মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার মাধ্যমে যুদ্ধটি নতুন করে শুরু হয়। তবে ইসরায়েল এখন পর্যন্ত সরাসরি এই যুদ্ধে অংশ নেয়নি।

যুদ্ধে না জড়ালেও স্মোট্রিচ স্পষ্ট করেছেন যে, ইসরায়েল এই যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে চায়। তিনি বলেন, আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে ইসরায়েলের চূড়ান্ত লক্ষ্য, যা যুক্তরাষ্ট্রের না-ও হতে পারে, তা হলো ইরানের বর্তমান সরকারকে দুর্বল করা এবং পতন ঘটানো। তার মতে, ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস করাই এই লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর পথ।

ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরে স্মোট্রিচ বলেন, বর্তমানে ইরানে মূল্যস্ফীতি ৮৫ শতাংশ, মাত্র চার মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৩৪ শতাংশের বেশি এবং প্রতি ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের বিনিময় হার ১৯ লাখে দাঁড়িয়েছে—এবং এটি বেড়েই চলেছে। এরপর তিনি আবারও নিজেদের যুদ্ধে না জড়ানোর বিষয়ে জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের জন্য ভালো, আর এর ভেতরে নিজেদের অযথা জড়ানোর কোনো মানে নেই।

উল্লেখ্য, গত ১৭ জুন ওয়াশিংটন ও তেহরান সামরিক অভিযান বন্ধ এবং ৬০ দিনের আলোচনা শুরু করতে একটি ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেন এবং সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে চাপ দেন। চুক্তির প্রথম শর্ত লেবাননে হামলা বন্ধ করার কথা থাকলেও ইসরায়েল তা অব্যাহত রেখে চুক্তিটি ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করে।

চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছিলেন, ইসরায়েল সরকারের কিছু ব্যক্তি ওয়াশিংটনকে কূটনীতি থেকে দূরে সরিয়ে ইরানের সঙ্গে আরও গভীর যুদ্ধে জড়ানোর চেষ্টা করেছে। জো রোগানের পডকাস্টে তিনি বলেন, আপনারা দেখেছেন কীভাবে অত্যন্ত গোপনে এবং বিপুল অর্থায়নের মাধ্যমে এই আলোচনা ও চুক্তি ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়েছে।

ইসরায়েল হয়তো এই যুদ্ধকে নিজেদের জন্য ‘ভালো’ মনে করছে, কিন্তু এর চরম মূল্য চোকাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এখন পর্যন্ত ১৭ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন অন্তত ৪২০ জন এবং নিখোঁজ রয়েছেন একজন।

‘ইরান ওয়ার কস্ট ট্র্যাকার’-এর গত ১৬ জুনের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধে মার্কিন করদাতাদের ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হয়েছে। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘ইরান ওয়ার এনার্জি কস্ট ট্র্যাকার’-এর তথ্যমতে, মার্কিন পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ বাবদ ৭১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থাৎ পরিবারপ্রতি প্রায় ৫৪৪ ডলার গুনতে হয়েছে। যুদ্ধ চলমান থাকায় এই খরচের পরিমাণ এখন আরও অনেক গুণ বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights