গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা বলল বিএনপি, অন্যদের ভিন্ন মত
শফিউল আলম দোলন ও শফিকুল ইসলাম সোহাগ
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এর মধ্যে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগকে সাংবিধানিকভাবে অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। দলটির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, রাষ্ট্রপতি আওয়ামী লীগের নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও তিনি বিএনপি সরকার এবং সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। বিশেষ করে, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আগে ৫ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘দেরিতে হলেও মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের ফলে জনগণের ঘাড় থেকে স্বৈরাচার নেমে গেছে। এটা আমাদের জন্য বড় পাওয়া।’
বাংলাদেশের কমিউিনিস্ট পার্টির নেতারা বলেন, ক্ষমতাসীন বিএনপির অভিপ্রায়ের ভিত্তিতেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। এ নিয়ে কেউ পানি ঘোলা করতে চাইলে প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি, এবি পার্টিসহ বিভিন্ন ইসলামী দলসহ অন্য দলের নেতারাও এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রাষ্ট্রপতির পদটি বিএনপি কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে নয়, বরং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখছে। আমরা এটিকে (রাষ্ট্রপতি পদ) একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখি। আমরা দেখেছি, সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তিনি আমাদের সরকারকে সহযোগিতা করেছেন। গতকাল দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের আগে সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি যেহেতু স্বৈরাচারী সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তাই সেই সময়কার কিছু সমালোচনা ছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আগে ৫ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত তিনি যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সংকটের সময়ে রাষ্ট্রকে সাংবিধানিক পথে রাখার ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রশংসার দাবিদার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, এটাও সত্য যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রপতিকে যথাযথ ও মর্যাদার সঙ্গে তাঁর দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয়নি। এদিকে, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ একটি স্বাভাবিক ঘটনা ও প্রক্রিয়া।’
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগকে সাধুবাদ জানিয়ে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘দেরিতে হলেও জনগণের ঘাড় থেকে স্বৈরাচার পদত্যাগ করেছেন, এটা আমাদের জন্য বড় পাওয়া।’ গতকাল সন্ধ্যায় বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে গণমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি একথা বলেন। ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর যদি তাঁর বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়, তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের কথা ভাবা হবে। সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি যদি চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে চান, তবে কি তাঁকে যেতে দেওয়া হবে?
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেছেন, ক্ষমতাসীন বিএনপির অভিপ্রায়ের ভিত্তিতেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। সুতরাং বর্তমান রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে এটা একটা স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখছি। এটা আমার প্রথম কথা। দ্বিতীয় কথা হলো- আমরা একটা ন্যূনতম গণতন্ত্রের পথে হাঁটার চেষ্টা করছি, প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। ভিতরে বাইরে নানা ধরনের অপশক্তি আছে। সুতরাং এটাকে নিয়ে অনেকে হয়তো পানিঘোলা করতে চাইবেন সেটাকে কোনোক্রমেই প্রশ্রয় দেওয়া সরকারের উচিত হবে না। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের প্রতিক্রিয়ায় সাবেক মন্ত্রী ও জাতীয় পার্টি একাংশের মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সময়ের ব্যবধানে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে তো যেতেই হতো। তিনি এখন যে গেলেন এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যাওয়াটাই স্বাভাবিক। তিনি আওয়ামী লীগের নিয়োগপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তিনি যে এতদিন ছিলেন এটাই তাঁর সৌভাগ্য। সবার সঙ্গে সমঝোতা, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা দিয়ে তিনি সময় পার করেছেন।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের মূল শেখ হাসিনা, তার চোর-লুটেরা মন্ত্রিপরিষদকে বিতাড়িত করতে সংগ্রামী ছাত্র-জনতার মাত্র ৩৬ দিন লেগেছিল। এজন্য লেগেছিল সবার ঐক্যবদ্ধতা। সংবিধানের দোহাই, সংসদ, আইনের ফাঁকফোকর কিছুরই প্রয়োজন হয়নি।’ এবি পার্টির নেতারা মো. সাহাবুদ্দিনের দুর্নীতি, ব্যাংকের টাকা লুটপাট ও পাচারসহ সব অভিযোগ তদন্ত করে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
এদিকে, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নির্বাহী সভাপতি মাওলানা একে এম আশরাফুল হক বলেন, ‘মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মাধ্যমে রাষ্ট্রে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বড়ধরনের একটি চিহ্নের অবসান হয়েছে। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে সরকার গঠন ও প্রথম সংসদ অধিবেশনে ডিপ স্টেটের নির্দেশনায় জামায়াত ও তার সহযোগীরা যে অস্থির পরিবেশ তৈরি করতে চেয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যন্ত কৌশলে তা মোকাবিলা করে বঙ্গভবনকে আজ আওয়ামী লীগ মুক্ত করেছেন।’
