পাকিস্তানের সতর্কীকরণ, বাংলাদেশের চয়ন
বিশেষ প্রতিনিধি
কোনো দেশের সেনাবাহিনীর প্রকৃত শক্তির পরিচয় শুধু কতগুলো যুদ্ধ জিতেছে তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বরং ক্ষমতা নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো লড়াইয়ে সংযত থাকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। অনিশ্চয়তা ঘিরে ধরে দেশকে। আর ইতিহাসের নানা সময়ে বহু দেশের মতোই, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও নিজেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে আবিষ্কার করে। প্রশ্ন ছিল, সেনাবাহিনী আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারবে কিনা। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, তারা কি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিজেদের সাংবিধানিক সীমা মেনে চলবে কিনা?
ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক সংকট প্রায়ই সামরিক বাহিনীর জন্য ক্ষমতায় প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেনাবাহিনী এই যুক্তি দেখিয়ে হস্তক্ষেপ করেছে- যে, একমাত্র তারাই জাতিকে বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। কিন্তু অভিজ্ঞতা বারবার প্রমাণ করেছে, যখন সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়, তখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশও এ অভিজ্ঞতার বাইরে নয়। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপের পরিণতি দেশ দেখেছে। তাই ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাগুলো বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। পরবর্তী ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট- বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতীয় সংকটকে স্থায়ী রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার সুযোগে পরিণত করেনি। এই সংযমই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা— কিন্তু অনুসরণ করার মতো কোনো মডেল নয়। ১৯৫৮ সালের প্রথম সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে পাকিস্তান জেনারেল আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জিয়া-উল-হক এবং পারভেজ মোশাররফের শাসনামলে বারবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক প্রভাবের অধীনে ছিল। প্রতিবারই হস্তক্ষেপকে স্থিতিশীলতায় ফিরিয়ে আনা, দুর্নীতি দমন কিংবা জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর ফল হয়েছে ভিন্ন। বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে, আর এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে নির্বাচিত সরকারগুলো প্রায়ই পূর্ণ কর্তৃত্ব নিয়ে কাজ করতে পারেনি।
এই ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট; সেনাবাহিনী তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তারা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করে। বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাস এই তুলনাকে আরও গভীর অর্থ দেয়। ১৯৭১ সালের ঘটনাবলি আমাদের জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মুক্তিযুদ্ধ শুধু স্বাধীনতার জন্য লড়াই ছিল না; এটি ছিল গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ এবং রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধেও এক সংগ্রাম। ইতিহাসকে কখনও ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে, আজও পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, আইনজীবী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বারবার রাজনৈতিক স্বাধীনতা, জবাবদিহি এবং বেসামরিক বিষয়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। পাকিস্তানের মানবাধিকার আইনজীবী হিনা জিলানিসহ অনেকেই আরও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক পরিসর সুরক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি আবারও পাকিস্তানকে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতার সময় ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও যোগাযোগের কেন্দ্রে দেখা যাওয়া বিশ্লেষকদের মধ্যে সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃত্বের ভারসাম্য নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
সমালোচকরা মনে করেন, এই ‘প্রতীকী উপস্থিতি’ একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনেছে। তা হলো— একটি সংসদীয় গণতন্ত্রে দেশের বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্ব কি নির্বাচিত নেতারা করবেন, নাকি সামরিক কমান্ডাররা? সৈন্যদের আত্মত্যাগকে খাটো করা এই বিতর্কের উদ্দেশ্য নয়। কিংবা এটি পাকিস্তানের জন্যও কোনো পৃথক বিষয় নয়। বরং এটি একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। আর তা হলো; রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতেই থাকবে, আর সশস্ত্র বাহিনী রাষ্ট্রের পেশাদার রক্ষক হিসেবে তাদের ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
পাকিস্তানের সামরিক প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা দেশটির অভ্যন্তরেও রয়েছে। ভারতের মাটিতে পাকিস্তানভিত্তিক একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হামলার পর ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে বিজয় নিয়ে সামরিক বাহিনীর দেওয়া সরকারি বর্ণনার সমালোচনা করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বোন নরিন নিয়াজি। তার অভিযোগ, সরকারি বয়ান ঘটনাপ্রবাহকে সঠিকভাবে তুলে ধরেনি।
তার দাবির সঙ্গে কেউ একমত হোন বা না হোন, এতে একটি বৃহত্তর বিতর্কের প্রতিফলন ঘটেছে। তা হলো— স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সামরিক ক্ষমতা ও জনগণের আস্থার মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন। বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এই শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যে সেনাবাহিনী রাজনৈতিক পরিসর দখল করে, তা কোনো শক্তিশালী সেনাবাহিনী নয়। বরং যে সেনাবাহিনী গণতন্ত্রের পথকে সুগম রাখে, সেই সেনাবাহিনীই শক্তিশালী।
একটি দেশ তখনই নিরাপদ হয়, যখন প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তার নিজ নিজ অবস্থান সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে। সংসদকে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে হবে। আদালতকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে। আর সশস্ত্র বাহিনীকে দেশ ও সংবিধান রক্ষা করতে হবে।
পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যখন সেনাবাহিনী স্থায়ী রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারীতে পরিণত হয়, তখন গণতন্ত্র এবং সেনাবাহিনী— উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সশস্ত্র বাহিনী দেশ পরিচালনা করে নয়, বরং দেশকে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই দীর্ঘস্থায়ী সম্মান অর্জন করবে। জুলাই ২০২৪-এর সম্মুখসারিতে থাকা প্রজন্মের জন্য এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা: যারা ক্ষমতা দখল করে— তারা সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান নয়; বরং তারাই সবচেয়ে শক্তিশালী যারা ক্ষমতার সীমা মেনে চলার মতো সুশৃঙ্খল।
