ইরানের খাইবার শেকানেই যুক্তরাষ্ট্রের সর্বনাশ

অনলাইন ডেস্ক

সহজেই পরিবহনযোগ্য, দ্রুত মোতায়েনযোগ্য, লক্ষ্যবস্তুতে অত্যন্ত নিখুঁত এবং তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম খরচ; ইরানের তৈরি নতুন মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘খাইবার শেকান’কে ঠিক এভাবেই বর্ণনা করছেন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা। সাধারণত নির্দিষ্ট গতিপথের কারণে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করা সহজ হলেও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে সম্প্রতি একাধিক খাইবার শেকান সফলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। এই ঘটনা প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।

মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে নিশানা করতে তেহরান তাদের সামরিক কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। আঘাত হানার শেষ মুহূর্তে গতিপথ পরিবর্তন, গতি নিয়ন্ত্রণ ও মাঝআকাশে কৌশলগত চাল খাটাতে সক্ষম এই খাইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা প্রাচীর ভেঙে দিতে পারদর্শী হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে কম খরচের ড্রোন এবং সাধারণ গতিপথের ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বয়ে তৈরি জটিল আক্রমণ কৌশলের অংশ হিসেবে এই ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে ইরান, যা মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধাঁধায় ফেলে দিচ্ছে।

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ২০২২ সালে প্রথম এই ক্ষেপণাস্ত্রটি উন্মোচন করে। ‘ফাতেহ’ গোত্রের কঠিন জ্বালানি চালিত এই ক্ষেপণাস্ত্রের নাম রাখা হয়েছে সপ্তম শতাব্দীর খায়বারের যুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে। সাধারণ তরল জ্বালানির পুরনো ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর জন্য দীর্ঘ প্রাক-উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতো, যা শত্রুপক্ষের স্যাটেলাইট বা রাডারে সহজেই ধরা পড়ে যেত। তবে কঠিন জ্বালানি ব্যবহারের ফলে খাইবার শেকান দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুত রাখা যায় এবং ট্রাক বা অন্যান্য যান থেকে দ্রুত উৎক্ষেপণ করে সহজেই অবস্থান পরিবর্তন করা সম্ভব হয়।

সাধারণ ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মহাকাশের উচ্চসীমা ছুঁয়ে নির্দিষ্ট পথ ধরে নিচে নেমে আসে বলে সেগুলোর গতিপথ আগে থেকেই অনুমান করে ঠেকিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু খাইবার শেকানের মূল শক্তি হলো এর বিচ্ছিন্নযোগ্য ওয়ারহেড। প্রায় ৫০০ কেজি ওজনের বিস্ফোরকবাহী এই অংশটিতে একটি ছোট ইঞ্জিন যুক্ত রয়েছে, যা চূড়ান্ত মুহূর্তে গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। এছাড়া এই কৃত্রিম উপগ্রহ-পরিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রটি চীনের বেইদু নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম ব্যবহার করায় এর আঘাত হানার সঠিকতা বহুগুণ বেড়ে গেছে।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, খাইবার শেকানের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এর উৎপাদন খরচ। ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে যে খরচ হয়, তা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র যেমন প্যাট্রিয়ট, থাড কিংবা এসএম-৬ ইন্টারসেপ্টরের খরচের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। উদাহরণস্বরূপ, একটি এসএম-৬ বা প্যাট্রিয়টের পিএসি-৩ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয় প্রায় ৪ থেকে ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর ফলে একটি সস্তা ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে গিয়ে পেন্টাগন মারাত্মক অর্থনৈতিক ও মজুদ সংকটের মুখে পড়ছে। সেন্ট্রাল অ্যান্ড আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র (সিএসআইএস)-এর হিসাব অনুযায়ী, সম্প্রতি ব্যবহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট, থাড এবং এসএম সিরিজের ইন্টারসেপ্টরের মজুদ উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাবেক জেনারেল জোসেফ ভোটেটের মতে, ইরান প্রতিটি সামরিক হামলা থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে নিজেদের প্রযুক্তিকে আরও কার্যকর করে তুলছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র: ইউরোএশিয়ান টাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights