সোশ্যাল মিডিয়ায় অপ্রাপ্তবয়স্করা

সুদীপ্ত দাস

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাঈম ইসলাম। স্কুল থেকে ফিরেই মোবাইল নিয়ে বসে। প্রথম দিকে ফেসবুকে বা টিকটকে রিলস দেখত বা তৈরি করত। এরপর গেম খেলতে শুরু করে, একা একা। কিন্তু একসময় অনলাইনের সেই গেম খেলায় যুক্ত হয় একাধিক জন। দল বেঁধে ওরা খেলে, কথা বলে। কার সঙ্গে কথা বলে জানতে চাইলে বলে, বন্ধুদের সঙ্গে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘরের ভিতর মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বাইরে খেলাধুলা বা ঘুরতে যেতে চায় না। নাওয়াখাওয়ায় আগ্রহ নেই। জোর করে ধরে এনে খাওয়াতে হয়। পড়াশোনা নাওয়াখাওয়া বাদ দিয়ে এভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে বাধা দিলে চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুরু করে, খারাপ ব্যবহার করে। দিনদিন তার মেজাজ বেশি খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করছে। এসব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তার মা রাবেয়া ইসলাম। একই অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন মারজুকের মা মীম।

নাঈম ইসলাম, মারজুকের মতো এমন অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণ-তরুণী আছে যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউব শর্টস বা গেমসে ডুবে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার বা আসক্তির কারণে ওদের খেলাধুলা, পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা বই পড়ার মতো অভ্যাস কমে যায়। এ ছাড়া মানসিকভাবেও তারা সুস্থভাবে গড়ে উঠতে পারে না। তাদের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমার পাশাপাশি তারা চার দেয়ালের ভিতর থাকতেই বেশি পছন্দ করে। তাদের মতে, সামাজিক মাধ্যমগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন ব্যবহারকারীরা লাইক, কমেন্ট, শেয়ারের মাধ্যমে আনন্দ পান। অনেকেই আবার কোনো কিছু যেন মিস না হয়ে যায় এই ভয় থেকেই ঘন ঘন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটকের নোটিফিকেশন চেক করে। এভাবে তাদের প্রতিদিনের এই অভ্যাস কখন আসক্তিতে পরিণত হয় সেটা তারা বুঝতেও পারে না।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্তির কারণে অপ্রাপ্তবয়স্করা বাস্তব জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতেই বেশি সময় ও সংযোগ বজায় রাখে। ফলে বাস্তবের সামাজিক যোগাযোগ ও সম্পর্কগুলো বাধাগ্রস্ত হয়। পরিবার এবং বন্ধুদের সঙ্গে যে স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকার কথা, সেটি দুর্বল হয়ে যায়। এ ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্টের প্রভাব তাদের আচরণ ও চিন্তাভাবনায় নেতিবাচক পরিবর্তন আনে। বাস্তব সামাজিক দক্ষতা কম থাকার কারণে তারা অল্পতেই রেগে যায়, মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠে এবং অন্যের সঙ্গে মেলামেশা করতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হয়। তিনি আরও বলেন, তরুণরা তাদের চারপাশের মানুষের মূল্যায়নের চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার আলোকে নিজেকে বিচার করতে শুরু করে। এতে তাদের মধ্যে এক ধরনের পরিচয় সংকট তৈরি হয় এবং তারা নিজেদের সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে না। একপর্যায়ে তাদের ব্যক্তিত্বেও বড় পরিবর্তন ঘটে। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে এমন ২০ জন স্কুল-কলেজে পড়ুয়া শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০ জনের মধ্যে ১৩ জনই দৈনিক ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় অনলাইনে ব্যয় করে। এর মধ্যে ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের পাশাপাশি অনলাইনে গেম খেলায় আসক্ত। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে ওদের। তবে বাকি সাতজন শিক্ষার্থী সোশ্যাল মিডিয়াকে কেবল যোগাযোগের টুল বা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। এ ছাড়া তারা অনলাইন ক্লাস করার পাশাপাশি অনলাইন কোর্সের কাজেও এটি ব্যবহার করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শিশু-কিশোর ও তরুণদের সুস্থ, স্বাভাবিক ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিনোদনের সুযোগ সংকুচিত হয়ে গেছে। ব্যক্তিত্ব ও মানসিক বিকাশ শুধু পুথিগত বা নৈতিক শিক্ষা দিয়ে হয় না। এর জন্য সহশিক্ষা কার্যক্রম প্রয়োজন, যা বর্তমানে প্রায় বন্ধ বা সীমিত। খেলাধুলার মাধ্যমে তরুণরা লড়াকু মনোভাব এবং ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো দক্ষতা অর্জন করে। কিন্তু এই সুযোগ বন্ধ বা সংকুচিত হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে ভার্চুয়াল বিনোদনের পথ বেছে নিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সোশ্যাল মিডিয়াকে ঢালাওভাবে শত্রু ভাবা যাবে না। অনেকেই এর মাধ্যমে নিজের সৃজনশীলতা প্রকাশ করে থাকেন। বিকল্প না দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করলে উল্টো পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। এখানে রাষ্ট্র অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বিনোদনের উপযুক্ত পরিবেশ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি অবশ্যই তরুণদের জন্য সুস্থ বিকল্প বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে।

জানা যায়, ইউরোপ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ অনলাইন সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি ও সাইবার বুলিং থেকে নারী ও শিশুদের সুরক্ষা দিতে ইতোমধ্যেই বয়স বেঁধে দিয়ে আইন পাস করেছে। এর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলো। তারা নির্দিষ্ট বয়সসীমা নির্ধারণ করে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সীমিত করার আইন পাস করেছে। ফ্রান্সও গত ২২ জুলাই চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ বছরের কম বয়সিদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ করে আইন পাস করেছে। যুক্তরাজ্য ২০২৭ সালের শুরুর দিকে এবং নরওয়ে অতি শিগগিরই ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিষিদ্ধ করার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights