হরমুজ সংকট এশিয়াকে যা শেখালো
অনলাইন ডেস্ক
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান সংকটকে এতদিন মূলত তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার গল্প হিসেবেই দেখা হয়েছে। তবে নতুন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ওপর সংকটের প্রভাব একরকম ছিল না। কোথাও অর্থনীতি বড় ধাক্কা সামলাতে পেরেছে, কোথাও আবার সীমিত সক্ষমতা ও জ্বালানি নির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতার গুরুত্বও এই সংকটে নতুন করে সামনে এসেছে।
প্রথমদিকে অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, ইন্দোনেশিয়াই হবে সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশটির অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায় এবং এর প্রভাব পড়ে জাতীয় মুদ্রা রুপিয়াহর ওপর। কয়েক মাসের মধ্যে রুপিয়াহ এমন পর্যায়ে নেমে যায়, যা ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি সেই সময়ের মতো ব্যাংকিং সংকটের পূর্বাভাস নয়; বরং এটি উচ্চ আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপে সৃষ্ট একটি ভারসাম্যহীনতা।
বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে ফিলিপাইন। দেশটির জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত কৌশলগত তেল মজুত না থাকায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতেই দেশটিতে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এবং মূল্য কারসাজি ঠেকানোসহ বিভিন্ন জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
তবে এসব ব্যবস্থা সংকটের তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমালেও মূল সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। ডিজেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জীবিকা সংকটে পড়েন হাজারো গণপরিবহন চালক। একই সময়ে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন, কৌশলগত জ্বালানি মজুত এবং আধুনিক বিদ্যুৎ অবকাঠামো ছাড়া ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আরও বড় আকারে ফিরে আসতে পারে।
অন্যদিকে শুরুতে সবচেয়ে বিপর্যস্ত দেশগুলোর একটি ছিল স্থলবেষ্টিত লাওস। নিজস্ব তেল উৎপাদন না থাকায় সংকটের প্রথম কয়েক সপ্তাহে দেশটির শত শত পেট্রোল পাম্প বন্ধ হয়ে যায়। ডিজেলের দাম অল্প সময়ে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায় এবং জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক এলাকায় শিক্ষা কার্যক্রমও সীমিত করতে হয়। তখন ধারণা করা হচ্ছিল, ছোট অর্থনীতির দেশটি দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। সংকটের মধ্যেও থাইল্যান্ড লাওসে পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি অব্যাহত রাখে। পরবর্তীতে দুই দেশের মধ্যে নতুন সীমান্তবর্তী জ্বালানি সরবরাহ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে লাওসে জ্বালানির সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে এবং জরুরি ভিত্তিতে প্রত্যাহার করা কিছু করও পুনর্বহাল করা সম্ভব হয়। বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক সহযোগিতা লাওসের পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, থাইল্যান্ড ও লাওসের সম্পর্ক কেবল জ্বালানি সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। থাইল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে লাওস থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি করে আসছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এমন একটি সম্পর্ক তৈরি করেছে, যা সংকটের সময় উভয় পক্ষের জন্যই কার্যকর হয়েছে। একই সময়ে ভিয়েতনামের বন্দর ব্যবহার করে রাশিয়া থেকে লাওসে জ্বালানি সরবরাহের সম্ভাবনাও নতুন বিকল্প হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, হরমুজ সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে কেবল বড় অর্থনীতি বা বিশাল জ্বালানি মজুতই কোনো দেশের নিরাপত্তার একমাত্র ভিত্তি নয়। শক্তিশালী আঞ্চলিক সম্পর্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থাও সংকট মোকাবিলায় সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতায় লাওস তুলনামূলকভাবে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হলেও ফিলিপাইনকে এখনো জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ সংকটের অভিজ্ঞতা আসিয়ান দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ভবিষ্যতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিলে শুধু মজুতের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। বরং আঞ্চলিক সহযোগিতা, জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্কই সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে।
সূত্র: এশিয়া টাইমস
