শিল্পায়নের স্বপ্নে দশক পার
কাজী শাহেদ, রাজশাহী
শিল্পায়নের যুগ। শিল্পায়নই এখন বড় অর্থনীতির প্রধান হাতিয়ার। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল শিল্পায়নে এগিয়ে গেলেও উত্তরাঞ্চল এখনো পিছিয়ে। আর এ অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনার লক্ষ্য নিয়ে রাজশাহীতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০১৬ সালে। কিন্তু পরিকল্পনা ঘোষণার এতদিন পরও প্রকল্পটির দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে সম্ভাবনাময় এ অঞ্চলে বড় শিল্প স্থাপন, দেশিবিদেশি বিনিয়োগ এবং নতুন কর্মসংস্থানের আশা ক্রমেই ম্লান হয়ে পড়ছে।
২০১৬ সালে রাজশাহীর পবা উপজেলার কয়রা, জয়কৃঞ্চপুর, মাড়িয়া, বালানগর ও ভবানীপুর এলাকায় প্রায় ২০৪ দশমিক ৬ একর জমির ওপর অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়। সম্ভাব্য এ স্থানের সঙ্গে সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগের সুবিধা থাকায় একে শিল্পায়নের জন্য উপযোগী মনে করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে পাঠালেও প্রকল্পটি আর এগোয়নি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রাজশাহীতে গ্যাসের সীমাবদ্ধতা, উন্নত শিল্প অবকাঠামোর অভাব এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বড় বিনিয়োগকারীরা অন্য জেলায় চলে যাচ্ছেন। কৃষিভিত্তিক শিল্প, আম প্রক্রিয়াজাতকরণ, সিল্ক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত ও হালকা প্রকৌশল শিল্প গড়ে ওঠার যথেষ্ট সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় সরকারি উদ্যোগের অভাবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ পাচ্ছে না।
রাজশাহী এখন পর্যন্ত কৃষিপ্রধান। আর এ অঞ্চলের ভূমিও উর্বর। এখানে বিঘাপ্রতি ৬০-৭০ মণ টম্যাটোর ফলন হয়। প্রতি মণ ১ হাজার টাকা হিসাবে বিঘাপ্রতি আয় হতে পারে ৬০-৭০ হাজার টাকা। ধান বা অন্য ফসল চাষে এ আয় সম্ভব নয়। রাজশাহী অঞ্চলে টম্যাটো বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। অন্যদিকে, এই জেলায় প্রতি বছর ১ হাজার ৫৬১ কোটি টাকার পান কেনাবেচা হয়। প্রতি বছর এ অঞ্চলে আমের বিকিকিনি হয় ১ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা)। এখানে আমসহ কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠলে স্থানীয় কৃষকরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি এ অঞ্চলে কর্মসংস্থান বাড়বে।
ব্যবসায়ী নেতারা আরও বললেন, রাজশাহীতে শিল্পকারখানা না হওয়ার বড় কারণ গ্যাসের সংকট। রাজশাহী চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকু বলেন, বাংলাদেশ এখন দুই ভাগে বিভক্ত-গ্যাসসমৃদ্ধ অঞ্চল এবং গ্যাসশূন্য অঞ্চল। দেশের ৯০ ভাগ শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে গ্যাসসমৃদ্ধ অঞ্চলে। আর শিল্প গড়ে না ওঠায় এ অঞ্চলে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য দুটোই প্রকট। অথচ এ অঞ্চল শ্রমঘন ও শ্রমিকের যোগানও ভালো। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা আঞ্চলিক বৈষম্য রোধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে জানা নেই। তিনি বলেন, ২০১৬ সালে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। সে সময় সরকারিভাবে স্থান পরিদর্শন করে চূড়ান্ত করা হয়। ২০১৯ সালে এটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সাত বছরেও তা আলোর মুখ দেখল না।
রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে গ্যাস-সংযোগ দেওয়া হয়েছিল। নয় হাজারের মতো বাসাবাড়িতে গ্যাস গেছে। এ ছাড়া ছয়-সাতটি কারখানায়ও গ্যাস-সংযোগ দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনের পর আবার সেই উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যায়। অর্থনৈতিক অঞ্চলটি হলে এখানে শিল্প গড়ে উঠত। এখন তো আর সেটি হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।
রাজশাহী চেম্বারের সভাপতি হাসেন আলী বলেন, রাজশাহীতে ষাটের দশকে সরকারি উদ্যোগে এখানে একটি চিনিকল, একটি পাটকল, একটি টেক্সটাইল এবং একটি রেশম কারখানা স্থাপন করা হয়েছিল। ক্রমাগত লোকসানের কারণে চিনিকল বন্ধ হয়ে গেছে। টেক্সটাইল কারখানাটি আংশিক চালু আছে, তা-ও ইজারার মাধ্যমে। রাজশাহীর ঐতিহ্য হিসেবে পরিচিত রেশম কারখানাটি কখনো চালু হয়, কখনো বন্ধ থাকে। অর্থনৈতিক অঞ্চলটি গড়ে উঠলে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতেও গতি আসত। তিনি বলেন, রাজশাহী বিসিক নগরীতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের অনেক শিল্প আছে। কিন্তু সেখানকার উদ্যোক্তারা চান, কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানার জন্য আলাদা একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হোক।
