মার্কিন বিনিয়োগে দেশের এফডিআই পুনরুত্থানের সুযোগ
অনলাইন ডেস্ক
একসময় বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রধান উৎস ছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে গত এক দশকে দেশটির বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সময়ে চীনের বিনিয়োগ দ্রুত বেড়ে বাংলাদেশে এফডিআইয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বাংলাদেশের মোট এফডিআইয়ের প্রায় ২২ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার এসেছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তা কমে দাঁড়ায় মোট এফডিআইয়ের ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ বা প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে চীনের বিনিয়োগ প্রায় সাত গুণ বেড়েছে।
সম্প্রতি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গরের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক, বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ সতর্কতা সংশোধন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের ৪৫ জন জ্যেষ্ঠ নির্বাহীর সম্ভাব্য বাংলাদেশ সফর দুই দেশের বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জটিলতার কারণে মার্কিন বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দেয়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার। ওয়ালমার্ট, টার্গেট, গ্যাপ, পিভিএইচ ও ভিএফ করপোরেশনের মতো বড় ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি করলেও শিল্প খাতে প্রত্যক্ষ মার্কিন বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা, ওষুধশিল্প, ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডেটা সেন্টার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গর জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে চালু হওয়া ‘প্যাক্স সিলিকা’ উদ্যোগে বাংলাদেশ অংশীদার হতে পারে। এর মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া অবকাঠামো, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে অর্থায়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফিন্যান্স করপোরেশনের (ডিএফসি) সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক জ্যেষ্ঠ গবেষক জায়েদ বখত বলেন, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও রপ্তানি বহুমুখীকরণে সহায়ক। তবে অবকাঠামো উন্নয়নে বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও জাইকার মতো বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের বাংলাদেশ সফর বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে নীতির ধারাবাহিকতা, বন্দরসেবার উন্নয়ন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা নির্বিঘ্নে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা সহজ করা, শিল্পের জন্য গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, দ্রুত জমি বরাদ্দ, বিরোধ নিষ্পত্তিতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, শুল্কব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি।
