নো হর্ন হচ্ছে ছয় জেলায়

আলী আজম

নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, বগুড়াসহ দেশের ছয় জেলাকে পর্যায়ক্রমে শব্দদূষণমুক্ত, স্বাস্থ্যসম্মত ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার বন্ধ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন প্রয়োগের মাধ্যমে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যে শুরু হয়েছে ‘নো হর্ন’ কর্মসূচি। প্রাথমিক পর্যায়ে সব সরকারি যানবাহনে এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের যানবাহনে ‘সাইলেন্ট ড্রাইভিং’ স্টিকার সংযুক্ত করা হচ্ছে। শব্দদূষণ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এ উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছে। গতকাল জেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যানবাহনের চালকরা কারণে-অকারণে হর্ন দেন। শব্দদূষণ কমিয়ে নাগরিকদের জন্য নিরিবিলি পরিবেশ উপহার দিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে জেলার সরকারি যানবাহন অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার না করে চলাচল করবে। তবে পর্যায়ক্রমে জেলার সব ধরনের যানবাহনকে এর আওতায় আনা হবে। সর্বত্র শব্দদূষণ বাড়ায় শিক্ষার্থী, রোগী, বয়স্ক ব্যক্তি, নারী ও শিশু এবং সাধারণ মানুষ নানা ধরনের রোগ ও ভোগান্তির মধ্যে পড়ছে। সরকারি যানবাহনের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করে দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সংশ্লিষ্ট জেলাকে নো হর্ন মুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। সংশ্লিষ্ট জেলার সব প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানুষের কানের সহনশীল মাত্রা ৫৫ ডেসিবল। এর বেশি শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তির জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত শব্দে হৃদরোগ ও স্থায়ী বধিরতার ঝুঁকি বাড়ে ৪০ শতাংশ, এ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা ও বিরক্তি, মানসিক চাপ, ঘুমের ও মনোযোগে ব্যাঘাত এবং শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ কারণে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শব্দদূষণ রোধে হাইড্রোলিক ও অবৈধ উচ্চশব্দের হর্ন অপসারণে বিশেষ অভিযান, নীরব এলাকায় নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, শব্দদূষণবিরোধী গণসচেতনতা বৃদ্ধি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রচারণা এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গত ২৯ জুলাই গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভাওয়াল সম্মেলন কক্ষে জেলার দপ্তরপ্রধানদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জেলা প্রশাসক বলেন, শব্দদূষণমুক্ত করার উদ্যোগ গাজীপুর জেলা প্রশাসনের একক উদ্যোগ নয়, বরং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, পরিবহন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এ উদ্যোগ সফল হতে পারে। প্রাথমিকভাবে আমরা জেলার সব সরকারি যানবাহনে এটা বাস্তবায়ন করছি, পাশাপাশি প্রতিটি যানবাহনে ‘নো হর্ন’ স্টিকার লাগানো হচ্ছে। যেন একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ হর্ন না দেয়। মতবিনিময় সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১২ সপ্তাহে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি যানবাহনে ‘নো হর্ন’ কার্যক্রম চালু করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃষ্টান্ত স্থাপন, সব সরকারি যানবাহনে ‘সাইলেন্ট ড্রাইভিং’ স্টিকার সংযুক্ত করা, সরকারি দপ্তরের চালকদের অঙ্গীকারনামা গ্রহণ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যানবাহনে অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার বন্ধ করা এবং হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকাকে ‘সাইলেন্ট জোন’ হিসেবে কার্যকর করা। এ ছাড়া শিল্পাঞ্চলের পোশাক কারখানা, টেক্সটাইল মিল, ওষুধ শিল্পসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ও ভাড়াকৃত যানবাহনে অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা, মোটরসাইকেল চালকদের নিয়ে ‘স্মার্ট রাইডার’ সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা, গণপরিবহন চালক ও মালিকদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা, সিএনজি ও অটোরিকশা থেকে উচ্চশব্দের হর্ন অপসারণ এবং প্রধান সড়কগুলোতে চালকদের প্রতিশ্রুতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, রেসকিউ ও রাষ্ট্রীয় জরুরি সেবা ছাড়া অন্য যেকোনো যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন, হুটার, সাইরেন বা বিকট শব্দ সৃষ্টকারী অননুমোদিত হর্নের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করছে বিভিন্ন জেলা প্রশাসন। এটি বাস্তবায়নে বিআরটিএ ও জেলা পুলিশ সহযোগিতা করছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, শব্দদূষণের কারণে অনেক রোগ হচ্ছে। এ কারণে আমরা কানে শুনব না, খিটখিটে জাতিতে পরিণত হবো।

এমনকি অন্যকে টলারেন্স ক্ষমতাও কমে যাবে। গাজীপুর জেলা আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর জেলা কমান্ড্যান্ট মো. আশিকউজ্জামান বলেন, গাজীপুর জেলাকে শব্দদূষণমুক্ত করতে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরপ্রধানদের সঙ্গে জেলা প্রশাসক মতবিনিময় সভা করেছেন। সেখানে বাস্তবায়নকারী হিসেবে প্রথমে সরকারি যানবাহনে অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার থেকে বিরত রাখার বিষয়ে অঙ্গীকার করা হয়েছে এবং শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। সেটা আমরা পালন করছি। পাশাপাশি বিভিন্ন যানবাহনে শব্দদূষণ প্রতিরোধে ‘নো হর্ন’ স্টিকার লাগিয়ে সচেতন করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights