ভুল টেস্টে বিপদে রোগী

জয়শ্রী ভাদুড়ী

পেটের ডানপাশে ব্যথায় মাসখানেক ধরে ভুগছিলেন সানজিদা ইয়াসমিন (৪৮)। রাজশাহীতে এক চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি পুরো পেটে আল্ট্রাসনোগ্রাম করতে বলেন। বেসরকারি এক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আল্ট্রাসনোগ্রাম করিয়ে রিপোর্ট নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে জানান তার জরায়ু পথে টিউমার হয়েছে। তা দ্রুত অপারেশন করতে হবে।

সানজিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘চিকিৎসকের কথা শুনে আমার পুরো পরিবার দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। আমরা অপারেশনের জন্য টাকা জোগাড় শুরু করি। তখন আমার স্বামী বলেন, অপারেশনের আগে আরেকবার ঢাকা থেকে ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন। আমাকে ঢাকা নিয়ে গিয়ে আবার আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হয়। সে রিপোর্ট নিয়ে আরেক চিকিৎসকের কাছে গেলে জানান টিউমারের কোনো অস্তিত্বই নেই। আগের রিপোর্ট দেখে অকারণে অপারেশন করলে আমার কত বড় ক্ষতি হতো ভাবলেই গা শিউরে ওঠে।’

দেশে অকারণে টেস্ট, ভুল রিপোর্ট, কেন টেস্ট করতে হবে এ বিষয়ে বুঝিয়ে না বলা, রোগীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে অনেক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর বিরুদ্ধে। এ নিয়ে চিকিৎসক সমাজেও রয়েছে আলোচনা। সময় নিয়ে রোগী দেখা, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা, ভালো ব্যবহার করা এবং অপ্রয়োজনীয় টেস্ট না দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা। কিন্তু এরপরও প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগীরা। দীর্ঘদিন পিঠের ব্যথায় ভুগছিলেন ফেরদৌসী বেগম (৪৮)। ব্যথা তীব্র হলে গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে বেসরকারি ক্লিনিকে এক চিকিৎসকের অ্যাপোয়েন্টমেন্ট নিয়ে দেখাতে যান তিনি। চিকিৎসক সমস্যা শুনে প্রথমে বেশ কিছু টেস্ট, এক্সরে করে নিয়ে আসতে বলেন। সেই হাসপাতালে বিল পরিশোধের সময় কী কী টেস্ট দিয়েছে জিজ্ঞেস করলে বিল কাউন্টার থেকে বলা হয় বিভিন্ন টেস্টের সঙ্গে পায়ের হাঁটুর হাড়ের এক্সরে করতে দিয়েছে।
ফেরদৌসী বেগম বলেন, আমি বিল পরিশোধ না করে পুনরায় চিকিৎসকের কাছে পিঠের ব্যথায় পায়ের এক্সরের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে চিকিৎসক ভীষণ বিরক্ত হন। তিনি যে টেস্টগুলো দিয়েছেন তার প্রয়োজনীয়তা আমাকে না বুঝিয়ে বরং বলেন চিকিৎসক কে? আপনি নাকি আমি? যেগুলো দিয়েছি সে টেস্টগুলো করে নিয়ে আসেন, পছন্দ না হলে অন্য চিকিৎসককে দেখান। অন্য রোগী ও তাদের স্বজনদের সামনে আমাকে এভাবে অপমান করেন। আমি ভীষণ কষ্ট পাই। টেস্ট না করিয়ে ফিরে আসি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘একজন চিকিৎসক রোগীর জন্য যে ওষুধ ও পরীক্ষা লিখবেন তা অবশ্যই ব্যাখ্যা করবেন। যদি কেউ ব্যাখ্যা না করেন, তাহলে তিনি রোগীর অধিকারকে রক্ষা করলেন না। ১৯৪৮ সালের জেনেভা ডিক্লারেশন অনুযায়ী চিকিৎসক এবং রোগীর কিছু অধিকার রয়েছে। চিকিৎসকের পাশে রোগী যখন চিকিৎসা প্রার্থী হয়ে বসেন তখন তাদের মধ্যে অলিখিত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অর্থাৎ তারা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা রাখবেন। পরস্পরকে সমস্যা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করবেন। তারা সৌহার্দ্যমূলক মানবিক আচরণ করবেন। যদি চিকিৎসক রোগীর প্রতি সে মনোভাব পোষণ না করেন তবে তিনি রোগীর অধিকার লঙ্ঘন করলেন। রোগীও চিকিৎসকের প্রতি তার দায়িত্ব বজায় রাখবেন।’

শুধু সরকারি হাসপাতালেই নয়, উন্নত চিকিৎসার জন্য অনেকে অর্থ খরচ করে যেসব বেসরকারি হাসপাতালে যান, সেখানেও রোগীদের অভিযোগ রয়েছে যে, তাদের চিকিৎসা, ওষুধ বা অপারেশনের ব্যাপারে ঠিকমতো অবহিত করা হয় না। এমনকি চেম্বারে চিকিৎসকরাও রোগীদের কথা ভালোভাবে না শুনেই চিকিৎসাপত্র দেন বলে অভিযোগ আছে। ঢালাও টেস্টের খরচে বেড়ে যায় চিকিৎসা ব্যয়। অনেক চিকিৎসক নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে টেস্ট করাতে বলেন। কিংবা যেখানে তিনি রোগী দেখেন সেই ক্লিনিক থেকে টেস্ট করাতে বলেন। ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালগুলোর আয়ের বড় উৎস এই টেস্ট। এই টেস্ট বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো নীতিমালা হয়নি। কোন টেস্টের সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন দামের কোনো নির্ধারিত মানদণ্ড না থাকায় রোগীদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো দাম রাখছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেছেন, ‘দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আস্থার সংকট আছে। এখানে চিকিৎসা খরচ বেশি, চিকিৎসা নিতে গিয়ে দুর্ভোগের শিকার হতে হয় রোগীদের। চিকিৎসা সবই ঢাকা কেন্দ্রিক। দেশের ডায়াগনস্টিকের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চিকিৎসকরা রোগীদের পর্যাপ্ত সময় দেন না। সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা, দালাল চক্র, সেবার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। দেশে গুণগত মানের চিকিৎসক আছেন। কিন্তু তারা বেশি রোগী দেখায়, যথাযথ মনোযোগ দেন না। চিকিৎসক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে রোগীর খরচ বেড়ে যায়। চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ওষুধ, টেস্ট এগুলো বেশি লেখার অভিযোগ আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালে সেবার দাম ও মান নির্ধারণ করে তা টানিয়ে রাখতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ক্যাটাগরি অনুযায়ী দাম ঠিক করে দিতে হবে। রোগী তার সামর্থ্য অনুযায়ী সেবা নিতে পারবে। ডায়াগনস্টিকেও দাম নির্ধারণ করে মান নিশ্চিত করতে হবে। প্রেসক্রিপশন অডিট চালু করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে ডায়াগনস্টিক সেবা জোরদার করতে হবে। চিকিৎসায় রেফারেল পদ্ধতি চালু করতে হবে’।

বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানের কর্মী শামীমা আক্তার। তার ১৬ বছরের ছেলে ইয়াসিন বেশ কিছু দিন ধরে মাথা ব্যথা করছে বলে জানাত। মাঝে মাঝেই বমি করত। একদিন বমি করে অজ্ঞান করে পড়লে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসককে দেখান। টেস্ট করিয়ে চিকিৎসকরা জানান সে ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত, দ্রুত অপারেশন করতে হবে। অপারেশন শেষে বেড না থাকায় মেঝেতেই ছেলেকে নিয়ে ছিলেন শামীমা।

তিনি বলেন, ‘অপারেশনের পরের দিন রাতে বেশ কিছু ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে একটা ওষুধ খাওয়াতেই ছেলে খুব অস্থির হয়ে উঠছিল। ছেলের এই অবস্থা দেখে রাতে জরুরি দায়িত্বে থাকা চিকিৎসককে ঘুম থেকে তুলে জিজ্ঞেস করলে উনি রেগে গিয়ে বলেন ফার্মেসিতে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন এটা কিসের ওষুধ। নার্সকে ডাকলে তারা আমার স্বামীর সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করে বলেন বারবার বিরক্ত করলে আনসার ডেকে বের করে দেব। ওইদিন ভোররাতে মারা যায় আমার ছেলেটা।’

চিকিৎসার জন্য ফের বিদেশমুখী ভিড় বেড়েছে। ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দূতাবাসে মেডিকেল ভিসার জন্য মানুষের ভিড় বাড়ছে। দেশের সরকারি হাসপাতালে অব্যবস্থাপনা, সংকট, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। বেসরকারিতে রয়েছে আস্থার সংকট, প্রতারণার ফাঁদ। উচ্চবিত্তের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা এসব কারণ আরও উসকে দিচ্ছে। ভালো সেবার আশায় মধ্যবিত্ত এমনকি নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষও ছুটছেন বিদেশ। জানা যায়, উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতি বছর দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। কভিড-১৯ সংক্রমণের কারণে বিদেশ যাত্রায় ছিল নানা বিধিনিষেধ। সব কিছু স্বাভাবিক হতেই মেডিকেল ভিসা নেওয়ার ভিড় বেড়ে গেছে ভিসা সেন্টারগুলোতে। ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরে যাওয়া রোগীদের ভিড় ঊর্ধ্বমুখী। ডা. লেলিন চৌধুরী আরও বলেন, ‘বিদেশমুখী চিকিৎসার অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে একটি মেডিকেল ট্যুরিজম। রোগী মনে করে দূরবর্তী জায়গায় গেলে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যাবে। নিউইয়র্ক থেকে লন্ডন যায়, বাংলাদেশ থেকে কলকাতা যায়, কলকাতা থেকে চেন্নাই যায় চিকিৎসা করাতে। এটা থাকবেই। আমাদের দেশের চিকিৎসকদের একটি অংশের মধ্যে রোগীর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের পরিবর্তে রোগীকে নির্দেশ দেওয়ার, আদেশ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। একজন মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য যায়, এটা তার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। চিকিৎসকদের একটি অংশ রোগীকে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন না। আমরা অনেক সময় দেখি অনেক চিকিৎসকের রোগীর প্রতি আচরণ সঠিক হয় না। তারা রোগীর প্রতি অমনোযোগী থাকেন। ফলে রোগীর মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights