এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য : পরিস্থিতি সামলাতে জোর প্রস্তুতি সরকারের

রাশেদ হোসাইন

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের উত্তরণ এখন সময়ের ব্যাপার। তবে এই ঐতিহাসিক মাইলফলকের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার হারানোর যে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা সামলাতে এখন থেকেই জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে প্রধান কৌশল হিসেবে নেওয়া হয়েছে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখা। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সিইপিএ) করাসহ ব্যবসাবাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অর্জনে বিভিন্ন চুক্তির দিকে নজর দিচ্ছে সরকার।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, ২০২৬ সালের পর বিশ্ববাজারে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখতে বহুমাত্রিক বাণিজ্য কৌশল ও নীতিগত সংস্কারের পথে হাঁটছে দেশ। রপ্তানি ও বিনিয়োগ বাড়াতে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে (সিইপিএ) এবং জাপানের সঙ্গে ইতোমধ্যে (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং চীনের সঙ্গে ইপিএ, সেপা এবং এফটিএ চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি কানাডার ‘জেনারেল প্রেফারেন্সিয়াল ট্যারিফ প্লাস’ সুবিধা কার্যকরভাবে ব্যবহারের প্রস্তুতি চলছে। ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়াতে ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি সেপা স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রসঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়াতে সার্ককে আরও কার্যকর করা, বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল (বিবিআইএন) মোটর ভেহিকেলস অ্যাগ্রিমেন্ট দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বিমসটেকের আওতায় বাস্তবমুখী সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। এতে আঞ্চলিক যোগাযোগ উন্নত হবে, পরিবহন ব্যয় কমবে এবং সরবরাহব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বহুল আলোচিত সিইপিএ স্বাক্ষর হয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা পাবে। অন্যদিকে কোরিয়ার ৮৭ শতাংশ পণ্য বাংলাদেশে একই ধরনের সুবিধার আওতায় আসবে। বাংলাদেশের ৮ হাজার ৪২৮টি পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার ১ হাজার ৫৪টি পণ্য বাংলাদেশের বাজারে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। এর আগে জাপানের সঙ্গে (ইপিএ) সই করেছে। এর ফলে বাজারটিতে তৈরি পোশাকসহ প্রায় ৭ হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্য শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ পাবে। বিনিময়ে বাংলাদেশও জাপানের জন্য তার বাজার সম্প্রসারিত করছে। ফলে বাংলাদেশের বাজারে ১ হাজার ৩৯টি জাপানি পণ্য পর্যায়ক্রমে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মোক্তাদির বলেন, সরাসরি ব্যবসা পরিচালনা বা বিনিয়োগ করা সরকারের কাজ নয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্দেশ্যে বেসরকারি খাতের জন্য একটি সুন্দর ও সহায়ক পথ তৈরি করে দেওয়া সরকারের কাজ। বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্যিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে সরকার অন্যান্য দেশের সঙ্গেও এফটিএ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। শিগগিরই আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট আরসিইপি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও ফ্রি ট্রেড নেগোসিয়েশন কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights