ধাতব মুদ্রা নিতে অনীহা, বাড়ছে ভোগান্তি

ফেনী প্রতিনিধি

ফেনীতে এক, দুই ও পাঁচ টাকার ধাতব মুদ্রা এবং ছোট মূল্যমানের পুরোনো নোট কার্যত লেনদেনের বাইরে চলে যাচ্ছে। বৈধ মুদ্রা হওয়া সত্ত্বেও দোকান, কাঁচাবাজার, গণপরিবহন, ফার্মেসি, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এসব পয়সা নিতে অনীহা দেখা দিয়েছে। ফলে প্রতিদিনই সাধারণ মানুষকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতার হাতে বৈধ খুচরো টাকা থাকা সত্ত্বেও তা গ্রহণ না করায় পণ্য কেনা বা ভাড়া পরিশোধে সমস্যায় পড়ছেন তারা। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীরাও ব্যাংকে খুচরো টাকা জমা দিতে গিয়ে নানা জটিলতার অভিযোগ তুলেছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, সচেতনতার অভাব এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে খুচরো টাকার সংকট এখন জাতীয় সমস্যায় রূপ নিয়েছে।

জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিনের ছোট ছোট লেনদেনে খুচরো টাকা নিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। দোকানদাররা অনেক সময় এক বা দুই টাকার মুদ্রা নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। কেউ কেউ পাঁচ টাকার কয়েন নিলেও বেশি পরিমাণে নিতে চাইছেন না। গণপরিবহনে যাত্রীরা খুচরো ভাড়া দিতে গেলে পরিবহনকর্মীরা তা ফিরিয়ে দিচ্ছেন। এতে যাত্রী ও পরিবহনকর্মীদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক এমনকি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে।

রেলগেট হকার্স মার্কেটের লোকমান স্টোরের মুদি দোকানি বলেন, প্রতিদিনই তার কাছে বিপুল পরিমাণ কয়েন জমা হয়। কিন্তু পাইকারি বাজারে এসব মুদ্রা সহজে নেওয়া হয় না। ব্যাংকে জমা দিতে গেলেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। ফলে বাধ্য হয়েই তিনি গ্রাহকদের কাছ থেকে খুচরো নিতে নিরুৎসাহিত করেন। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আরও অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।

অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, বৈধ মুদ্রা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে ব্যবসায়ীরা আইন লঙ্ঘন করছেন। অনেকেই জানান, পণ্যের দাম পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকা সত্ত্বেও শুধু খুচরো হওয়ার কারণে তাদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে বৈধ মুদ্রা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

ফেনীর সোনালী ব্যাংক প্রধান শাখার সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার পলাশ সূত্রধর বলেন, খুচরো টাকা গ্রহণে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে অধিক পরিমাণ মুদ্রা গণনা ও সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জনবল, বিশেষায়িত যন্ত্র এবং অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। অনেক শাখায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কয়েন জমা পড়লেও দ্রুত তা প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হয় না। ফলে গ্রাহকদের অপেক্ষা করতে হয়, যা অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ফেনী সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আফরোজা বানু বলেন, দেশের প্রচলিত সব বৈধ মুদ্রা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ইচ্ছামতো বৈধ মুদ্রা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে আইন প্রয়োগে দুর্বলতা এবং জনসচেতনতার অভাবে এই সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলমান। ছোট মূল্যমানের মুদ্রা বাজারে সচল না থাকলে দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, খুচরো টাকা অচল হয়ে পড়ার আরেকটি কারণ বাজারে ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন খুচরো ফেরত দেওয়ার পরিবর্তে মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে অর্থ পরিশোধে উৎসাহিত করছে। তবে একটি বড় জনগোষ্ঠী এখনও নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় খুচরো টাকার গুরুত্ব কমেনি।

ফেনী চেম্বার অব কমার্সের জুনিয়র সহসভাপতি সাঈদুর রহমান জুয়েল বলেন, ব্যাংকগুলোতে খুচরো টাকা জমা ও উত্তোলনের জন্য পৃথক কাউন্টার চালু করা, পর্যাপ্ত মুদ্রা গণনা যন্ত্র স্থাপন এবং নিয়মিতভাবে বাজারে খুচরো মুদ্রা সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বৈধ মুদ্রা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ।

ফেনী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, খুচরো টাকা গ্রহণে অস্বীকৃতি শুধু গ্রাহকের ভোগান্তিই বাড়াচ্ছে না, বরং বৈধ মুদ্রা সম্পর্কে মানুষের আস্থাও নষ্ট করছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, খুচরো মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ব্যাংক শাখায় দ্রুত মুদ্রা গ্রহণ ও বিনিময় ব্যবস্থা চালু, বাজারে নিয়মিত খুচরো সরবরাহ এবং ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচারণা ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পাশাপাশি বৈধ মুদ্রা প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিদিনের ক্ষুদ্র লেনদেন একটি দেশের অর্থনীতির ভিত্তিকে শক্তিশালী করে। বৈধ খুচরো মুদ্রা গ্রহণে অনীহার কারণে সেই লেনদেন ব্যাহত হলে এর প্রভাব শুধু সাধারণ মানুষের পকেটেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; ধীরে ধীরে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বাজারব্যবস্থা ও আর্থিক শৃঙ্খলার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অচল হয়ে পড়া খুচরো টাকা আবার সচল করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights