পশ্চিমারা কয়লার ব্যবহার কমানোয় ফের সবুজ হয়ে উঠছে আফ্রিকার সাহেল
অনলাইন ডেস্ক
এককালে খরা আর দুর্ভিক্ষের নামান্তর ছিল আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল। সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ সীমান্তে বিস্তৃত সাড়ে সাতশ’ মাইলের এই শুষ্ক ভূমিতে বছরের পর বছর ধরে প্রখর রোদে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গিয়েছিল, পানির অভাবে প্রাণ হারিয়েছিল লাখ লাখ মানুষ। কিন্তু গত কয়েক দশকে চেনা সেই চরম সাহেল ধীরে ধীরে এক অভাবনীয় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শুষ্ক মরুভূমির বুকে হঠাৎ করেই যেন ফিরে এসেছে পানির প্রবাহ, নতুন জীবনের স্পন্দন আর সজীবতার বার্তা।
আজ সাহেলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১৩ ফুট বা তারও বেশি উপরে উঠে এসেছে। বহু বছর ধরে শুকনো পড়ে থাকা কুয়া আর নদীগর্ভগুলো আবার কানায় কানায় ভরে উঠছে। বিলুপ্তপ্রায় শিংওয়ালা অরিয়ক্স হরিণ ফের মুক্ত আকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর মাঠজুড়ে দেখা মিলছে জিরাফ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর। বছরের পর বছর পানির মুখ না দেখা কৃষকরা এখন মাঠের পর মাঠে সবজি ও শস্য ফলাচ্ছেন, এমনকি নতুন করে রোপণ করছেন কোটি কোটি গাছপালা।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সাহেলের এই নাটকীয় পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো পশ্চিম আফ্রিকার শক্তিশালী মৌসুমি বায়ু। গত শতাব্দীর সত্তরের ও আশির দশকে এই মৌসুমি বায়ু দক্ষিণে আটকে থাকত, কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি বদলে গেছে। এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় কয়লা পোড়ানোর পরিমাণ কমানো এবং তার ফলে বাতাসে সালফেট অ্যারোসলের উপস্থিতি হ্রাস পাওয়া। আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তর অংশ উষ্ণ হওয়ার কারণে মৌসুমি বায়ু এখন আরও গভীর ভেতরে প্রবেশ করছে এবং প্রবল বর্ষণ ঘটাচ্ছে।
তবে কেবল সাধারণ বৃষ্টিপাতই এই পরিবর্তনের পুরো গল্প ব্যাখ্যা করতে পারে না। সাহেলে এখন এমন সব প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের সৃষ্টি হচ্ছে যা মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো অঞ্চল ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সাময়িকভাবে এ ধরনের প্রচণ্ড বর্ষণ বন্যা ও প্রাণহানির কারণ হলেও, মাটির নিচে পানি সঞ্চিত হতে এটি জাদুকরী ভূমিকা রাখছে। শক্ত ও খাঁ খাঁ করা জমিতে বৃষ্টির পানি সরাসরি শোষিত হতে না পেরে ছোট ছোট নদী ও শুকনো প্রণালি বেয়ে ছুটে যায়, আর সেখান থেকে একপ্রকার প্রত্যক্ষ চাপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ মূল পানির ভাণ্ডারকে দ্রুত পূর্ণ করে তোলে।
এই পানিসমৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে একসময়ের প্রায় শুকিয়ে যাওয়া চাদ হ্রদে। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যে সুবিশাল হ্রদটি শুকিয়ে প্রায় অদৃশ্য হতে বসেছিল, সেটি এখন ১৯৮০-র দশকের তুলনায় প্রায় দশগুণ বৃদ্ধি পেয়ে আবার ১৯৬০-র দশকের রূপ ফিরে পেয়েছে। স্যাটেলাইট ও মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য থেকেও দেখা গেছে, গ্র্যাভিটি বা অভিকর্ষজ টানের পরিবর্তনের মাধ্যমে সাহেল অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির বিপুল সঞ্চয়ের বিষয়টি স্পষ্ট ধরা পড়ছে।
বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাও এই সবুজ বিপ্লবে বড় ভূমিকা রাখছে। গ্রেট গ্রিন ওয়াল বা মহাশূন্য সবুজ প্রাচীর উদ্যোগের অধীনে আফ্রিকার সাধারণ মানুষ ও কৃষকরা পুরনো ঐতিহ্যবাহী পানি সংরক্ষণ পদ্ধতি ফিরিয়ে এনেছেন। পাহাড়ি ঢালে পাথরের বাঁধ দেওয়া, শস্যের মাঝে জাই পিট নামক ছোট ছোট গর্ত তৈরি করা কিংবা গাছের চারপাশে অর্ধচন্দ্রাকার মাটির ডিবি তৈরি করে পানি আটকে রাখার মাধ্যমে তারা মাটির আর্দ্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন।
এর পাশাপাশি কিছু অপ্রত্যক্ষ সামাজিক কারণও নদীগুলোকে আবার প্রাণবন্ত করতে সাহায্য করেছে। অতীতে বড় বড় সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে নদীর প্রায় পুরো পানি তুলে নেওয়ার ফলে নিচে আর কোনো পানি অবশিষ্ট থাকত না। কিন্তু অনেক স্থানে পুরনো সেচ প্রকল্পগুলো পরিত্যক্ত হওয়া এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বড় বড় কৃষি খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, এখন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধা না পেয়ে আবার লেক ও ভূগর্ভস্থ জলাধারে গিয়ে জমা হতে পারছে।
জলবায়ু বিজ্ঞানীরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন যে, একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সাহেল অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে। যদিও এল নিনো বা খামখেয়ালী আবহাওয়া সাময়িক দুর্যোগ তৈরি করতে পারে, তবুও টানা তিন দশকের এই পানির প্রত্যাবর্তন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সাহেল হয়তো সত্যিই একটি নতুন আর্দ্র ও উর্বর যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। যা একদা ছিল মরুময়তার প্রতীক, তা আজ নতুন আশা ও নতুন জীবনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স
