বগুড়ার সপ্তপদী মার্কেট যেন বড় দুর্ঘটনার অপেক্ষায়
আবদুর রহমান টুলু, বগুড়া
বগুড়া মহানগরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথায় প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সপ্তপদী মার্কেট এখন বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে। দীর্ঘদিনের পুরোনো তিনতলা ভবনটির বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়লেও ঝুঁকি নিয়েই চলছে ব্যবসা-বাণিজ্য। এর মধ্যে মার্কেটের ভেতরে দোকানের মধ্যে দোকান, ফুটপাত দখল এবং দোকানের সামনে অতিরিক্ত স্টল বসানোর কারণে পথচারী ও ক্রেতাদের চলাচলে দুর্ভোগ বাড়ছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনও বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বগুড়া সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মেয়াদোত্তীর্ণ সপ্তপদী মার্কেটটি ভেঙে সেখানে বহুতল আধুনিক শপিংমল নির্মাণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আরইউটিডিপি প্রকল্পের আওতায় নির্মিতব্য ওই শপিংমলে ভূগর্ভস্থ গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও থাকবে।
সরেজমিনে জানা গেছে, মার্কেটের দেড় শতাধিক দোকানের মধ্যে ১৩৮টি বর্তমানে সাবলেটে দেওয়া হয়েছে। এসব দোকান থেকে সাবলেটধারীরা মাসে প্রায় ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করছেন। এর বাইরে দোকানের সামনের অংশে টেবিল-চেয়ার বা ছোট স্টল বসিয়ে অনেকে আরও ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই অতিরিক্ত আয়ের বড় অংশ সিটি করপোরেশনের রাজস্ব খাতে জমা হচ্ছে না।
জানা যায়, প্রায় ২৩ শতাংশ জমির ওপর সপ্তপদী মার্কেটের সামনের অংশের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৬৮ সালে। মুক্তিযুদ্ধের পর নামমাত্র মূল্যে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে ১৯৭৪ সালে মার্কেটের পেছনের অংশের নির্মাণকাজ শুরু হয়। তিনতলা ভবনটিতে দেড় শতাধিক দোকানের পাশাপাশি অগ্রণী ব্যাংকের একটি শাখাও ছিল।
১৯৮৫ সালে তৎকালীন পৌরসভার চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম প্রতি বর্গফুট ৫০ পয়সা হারে ১৫ বছরের জন্য দোকান বরাদ্দের চুক্তি করেন। পরে ২০০৪ সালে ভাড়া বাড়িয়ে প্রতি বর্গফুট ৭ টাকা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৫ সালে আবার ভাড়া বাড়িয়ে নতুন চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হলে দোকান মালিকদের একাংশ আপত্তি জানান। কেউ কেউ বর্ধিত ১৭ টাকা ভাড়া মেনে নিলেও অন্যরা আদালতের শরণাপন্ন হন। ফলে কিছু দোকানের ভাড়া এখনো আদালতে জমা দেওয়ার ঘটনা রয়েছে।
মার্কেটের নিচতলায় ৫৫টি দোকান রয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অনেক বরাদ্দধারী সিটি করপোরেশনকে তুলনামূলক কম ভাড়া দিলেও সাবলেটে কয়েক গুণ বেশি অর্থ আদায় করছেন।
তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ভবনটির নিরাপত্তা নিয়ে। পুরোনো ভবনের বিভিন্ন অংশে জরাজীর্ণতা দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে দোকানের সামনে অতিরিক্ত স্থাপনা ও মানুষের ভিড় ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবনের কোনো অংশ ধসে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সাতমাথার মতো ব্যস্ত এলাকায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ চলাচল করায় ঝুঁকিটি আরও গুরুতর।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাস্মদ সাঈদ আলী জানান, ২০১৮ সালে মার্কেটটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে পরিত্যক্ত ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জেলা পরিত্যক্ত ঘোষণা কমিটির সভায় ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত হয় এবং আধুনিক বহুতল শপিংমল নির্মাণের পরিকল্পনা জানানো হয়। ওই সময় ১০ তলা ভবনের নকশা ও নির্মাণ-সংক্রান্ত প্রাথমিক কার্যক্রমও সম্পন্ন হয়েছিল। তবে নানা কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি বলেন, নতুন ভবন নির্মাণ করা হলে ব্যবসায়ীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সিটি করপোরেশনও বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজস্ব আদায়ের সুযোগ পাবে।
এদিকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে মার্কেটের পশ্চিম পাশে একটি ভবনের বর্ধিত অংশের ছাদ ধসে দুই পথচারী আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ধসে পড়া অংশটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ সপ্তপদী মার্কেট ভেঙে সেখানে বহুতল আধুনিক শপিংমল নির্মাণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আরইউটিডিপি প্রকল্পের আওতায় নতুন মার্কেট নির্মাণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
