২৫০ দিনের দীর্ঘ মিশন, ক্লান্তি-অবসাদে নাজেহাল রণতরীতে থাকা মার্কিন সেনারা

অনলাইন ডেস্ক

সমুদ্রে টানা আড়াইশ’ দিনের বেশি সময় কাটাতে গিয়ে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‌‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর হাজার হাজার সেনা ভয়ংকর মানবিক ও মানসিক সংকটে পড়েছেন। পর্যাপ্ত খাবার ও সুপেয় পানির ঘাটতি, বিকল শৌচাগার, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং দীর্ঘদিনের ক্লান্তি মিলিয়ে রণতরীটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর রূপ ধারণ করেছে। সেনাসদস্যদের এই দুরবস্থার খবর সামনে আসার পর পেন্টাগনের কাছে জরুরি জবাবদিহিতা দাবি করছেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা। ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য ও ইরান বিষয়ক সামরিক নীতির ওপর নতুন করে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

সামরিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রণতরীটিতে অবস্থানরত সেনাসদস্যদের মানসিক অবস্থার এতটাই অবনতি হয়েছে যে কেউ কেউ সাগরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করেছেন। চলতি মাসের শুরুর দিকেই এক নাবিক জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেন, যাকে পরবর্তীতে হেলিকপ্টারের সাহায্যে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

দীর্ঘ সময় ধরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, সচল লন্ড্রি ব্যবস্থার অভাব এবং তাজা খাবারের বদলে অপ্রতুল রেশনের কারণে নাবিকদের স্বাস্থ্যে মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। এক নাবিকের স্বজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এই মিশনে যোগ দেওয়ার পর থেকে চরম মানসিক চাপে পড়ে তার স্বজন প্রায় ২৯ কেজি ওজন হারিয়েছেন। দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা ইঞ্জিনের শব্দ, যুদ্ধবিমানের ওঠা-নামার বিকট গর্জন এবং তীরে নামার কোনো সুযোগ না থাকায় নাবিকদের মধ্যে মানসিক অবসাদ চরম সীমায় পৌঁছেছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্রেট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে পাঠানো এক চিঠিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি মৌলিক সামগ্রীর চরম ঘাটতি, পানির দূষণ, বিকল প্ল্যাম্বিং, নিরাপত্তার অভাব এবং দীর্ঘদিন চিঠি বা পার্সেল না পৌঁছানোর মতো বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, মার্কিন নৌবাহিনী কি সত্যিই বর্তমানে এই উচ্চমাত্রার অপারেশনাল চাপ বজায় রাখতে সক্ষম? একই সুর মিলিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেস সদস্য মাইক লেভিন জানান, জাহাজে ছত্রাকযুক্ত গোসলখানা, কাজ না করা টয়লেট এবং খাবারের চরম সংকটে নাবিকদের কখনো কখনো মাত্র অর্ধকাপ চাল ও দুটি টর্টিলা খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। এছাড়া সাবান, টুথপেস্ট বা ডিওডোরেন্টের মতো জরুরি প্রসাধনসামগ্রীও তাদের কাছে নেই। পরিস্থিতি তদারকিতে আইনপ্রণেতারা একটি নিরপেক্ষ প্রতিনিধি দলকে সরাসরি জাহাজে পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

তবে এই সকল অভিযোগ অস্বীকার করে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গণমাধ্যমে পরিবেশিত সংবাদকে অসত্য ও চরম বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছেন। পানামায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, প্রতিটি জাহাজ ও নাবিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অতিরিক্ত দীর্ঘ এই মিশনে সেনাসদস্যদের ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি দাবি করেন, সমুদ্রে প্রতিকূল পরিবেশ সত্ত্বেও সেনাদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছানো হচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান চলার কারণে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা কিছুটা ব্যাহত হলেও বর্তমানে রসদ ও চিকিৎসা সামগ্রী পৌঁছানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। হোয়াইট হাউজের তরফ থেকেও জানানো হয়েছে যে, মার্কিন বাহিনীকে যেকোনো সামরিক হুমকি মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত উপাদানে সজ্জিত রাখা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে রওনা হওয়া এই রণতরীটিকে দক্ষিণ চীন সাগর হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছিল। চলতি বছরের মে মাসে মিশন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বারবার এর মেয়াদ বাড়ানো হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আব্রাহাম লিংকনের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’ রণতরীটিকে পাঠাতে প্রস্তুত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গবেষণায় দেখা গেছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শাখার তুলনায় নৌবাহিনীর নাবিকদের মধ্যেই উচ্চমাত্রার মানসিক চাপ ও আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।

সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights