বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে সাড়ে তিন বছরে সর্বোচ্চে

অনলাইন ডেস্ক

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার মারাত্মক প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। এর ফলে বৈশ্বিক খাদ্য মূল্যসূচক বেড়ে বিগত সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছে। মূলত ফসল উৎপাদন হ্রাস পাওয়া এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে চরম বিঘ্ন ঘটায় গম, ভোজ্যতেল ও চিনির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রধান খাদ্যপণ্যগুলোর বাজার এখন চরম ঊর্ধ্বমুখী। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনার ভিত্তিতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স, আনাদোলু এজেন্সি ও হেলেনিক শিপিং নিউজ এ উদ্বেগজনক তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এফএওর সর্বশেষ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত জুলাই মাসে বৈশ্বিক খাদ্যের গড় মূল্যসূচক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩১ দশমিক ১ পয়েন্টে। যা ঠিক আগের মাস জুনের তুলনায় দশমিক ৬ শতাংশ এবং বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে সর্বাধিক লেনদেন হওয়া খাদ্যপণ্যগুলোর দর বিবেচনা করে প্রণীত এই সূচকটি ২০২৩ সালের জানুয়ারির পর থেকে এ পর্যন্ত অর্জিত সর্বোচ্চ মান। তবে স্বস্তির বিষয় এটুকুই যে, ২০২২ সালের মার্চে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর দিকে খাদ্যপণ্যের দাম যে রেকর্ড মাত্রায় লাফিয়ে উঠেছিল, বর্তমান সূচকটি এখনো তার চেয়ে ১৮ দশমিক ২ শতাংশ নিচে রয়েছে।

খাদ্য ও কৃষি সংস্থা জানিয়েছে, জুলাই মাসে মূলত শস্য, ভোজ্যতেল এবং চিনির অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির কারণেই সার্বিক সূচকে এই বড় লাফ দেখা দিয়েছে। যদিও এই সংকটময় সময়েও আন্তর্জাতিক বাজারে মাংস, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের দামে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেবল জুলাই মাসেই শস্যের মূল্যসূচক আগের মাসের তুলনায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১১৩ দশমিক ৮ পয়েন্টে পৌঁছেছে। বিশেষ করে কৃষ্ণ সাগরীয় অঞ্চলে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দরুন বন্দর অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং রফতানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে গম সরবরাহ নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়। এতে গমের দাম এক লাফে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে বিশ্বের প্রধান উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে তীব্র তাপপ্রবাহের আঘাত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খরার কারণে ভুট্টার দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, তবে সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম এখনো কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে।

অন্যান্য পণ্যের মধ্যে জুলাইয়ে ভোজ্যতেলের দর ২ শতাংশ বেড়ে গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ উচ্চতায় স্পর্শ করেছে। পাম অয়েল ও সয়াবিন তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলেই পুরো ভোজ্যতেলের বাজারে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার বায়োডিজেল খাতে অতিরিক্ত চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাম অয়েলের বাজারকে উসকে দিয়েছে, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেশি থাকায় সয়াবিন তেল চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া ইউরোপ ও এশিয়ায় এল নিনোর প্রভাবে দেখা দেওয়া খরা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে চিনির দাম বেড়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। এফএও গভীরভাবে সতর্ক করে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব ইউরোপে চলমান যুদ্ধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট আবহাওয়া সংকট অব্যাহত থাকলে তা বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তাকে ফের চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights