উদ্বেগ বাড়াচ্ছে সাগরের তাপমাত্রা

অনলাইন ডেস্ক

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব আর প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপর্যয়ের নজিরবিহীন খণ্ডচিত্র সামনে এসেছে। সাম্প্রতিকতম বৈজ্ঞানিক তথ্যানুযায়ী, পৃথিবীর মহাসাগরগুলোর গড় তাপমাত্রা এ যাবৎকালের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। মেরু অঞ্চলগুলোর বাইরের সাগরের উপরিভাগের গড় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ২১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রতিনিয়ত জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে যে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড জমা হচ্ছে, তার ফাঁদে আটকে থাকা অতিরিক্ত তাপের ৯০ শতাংশেরও বেশি অংশ একাই শুষে নিচ্ছে পৃথিবীর মহাসাগরগুলো। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের এই ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া সরাসরি গিয়ে আঘাত হানছে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাগরের উপরিভাগের এই অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি সরাসরি মেরু অঞ্চলের বরফ গলন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বিশ্বজুড়ে ঘন ঘন তৈরি হওয়া চরম আবহাওয়া বা দুর্যোগের তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বায়ুমণ্ডলে অধিক পরিমাণে শক্তি ও জলীয় বাষ্প সঞ্চারিত হওয়ায় প্রতিনিয়ত ভয়াবহ ঝড়, তীব্র সাইক্লোন ও অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে শতকোটি মানুষের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। সেই সঙ্গে সাগরের বুকে তৈরি হওয়া দীর্ঘস্থায়ী সামুদ্রিক তাপদাহ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি উপকূলীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতিকে তছনছ করে দিচ্ছে।

চলতি মৌসুমে ইতিমধ্যেই উত্তর গোলার্ধের বিভিন্ন দেশে চরম তাপদাহ, ভয়াবহ খরা এবং একের পর এক দাবানলের মতো দুর্যোগ আঘাত এনেছে। একই সময়ে এশিয়া মহাদেশে নজিরবিহীন অতিবৃষ্টি ও বিধ্বংসী টাইফুনের তাণ্ডব লক্ষ্য করা গেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রাকৃতিক আবহাওয়া চক্র ‘এল নিনো’-র দ্রুত বিকাশ সাগরের এই তাপমাত্রাকে আরও উসকে দিচ্ছে। সাগরের এই অস্বাভাবিক উষ্ণায়নের প্রভাবে ভারতে স্বাভাবিকের চেয়ে কম মৌসুমি বৃষ্টিপাত, ইন্দোনেশিয়ায় বিস্তৃত দাবানল এবং অস্ট্রেলিয়ায় ব্যাপক দাবানলের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।

সাধারণত দেখা যায়, দক্ষিণ গোলার্ধে স্থলভাগের চেয়ে জলভাগের বিস্তার অনেক বেশি হওয়ায় প্রতি বছর মার্চ ও এপ্রিল মাসে দক্ষিণ গোলার্ধের গ্রীষ্মকাল শেষে সাগরের তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে। কিন্তু তা কাটিয়ে আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে এসে তাপমাত্রা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়াকে চরম অস্বাভাবিক ও উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখছেন গবেষকরা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস’ নিশ্চিত করেছে যে, গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকের তুলনায় বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক তাপদাহের দিনের সংখ্যা তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবসৃষ্ট কয়েক দশকের ক্রমাগত বায়ুমণ্ডলীয় উষ্ণায়নের পটভূমিতে এল নিনো যুক্ত হওয়ায় সামুদ্রিক এই পরিবেশ পুরোপুরি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে।

সাগরের পানি অতিরিক্ত গরম হয়ে ওঠার ফলে তাপীয় প্রসারণ ঘটে, যার সরাসরি ফলাফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের নিম্নাঞ্চল ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলো স্থায়ীভাবে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। এর চেয়েও বড় আশঙ্কার বিষয় হলো, সাগর যত বেশি উত্তপ্ত হবে, বায়ুমণ্ডল থেকে অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নেওয়ার সক্ষমতা এটি ততটাই হারিয়ে ফেলবে। অর্থাৎ, যে মহাসাগর এতকাল পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করছিল, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সেই ক্ষমতার অপমৃত্যু ঘটছে, যা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য এক চরম অশনিসংকেত।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights