কেন সৌদি যুবরাজকে পাশ কাটিয়ে বাদশাহ সালমানকে চিঠি লিখল আমিরাত?
অনলাইন ডেস্ক
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানের পাঠানো একটি হাতে লেখা চিঠি নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সৌদি আরবের বয়োবৃদ্ধ বাদশাহ সালমানের কাছে সরাসরি পাঠানো এই চিঠিটিকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ক্ষমতাকে দৃশ্যত পাশ কাটানোর এক কৌশলগত প্রয়াস হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক ও আরব কূটনীতিকরা। আগামী ডিসেম্বরে আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট একটি পানি সম্মেলনে উপস্থিত থাকার জন্য বাদশাহকে ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানিয়ে মূলত এই চিঠিটি দেওয়া হয় বলে ইউএই-র সরকারি সংবাদ সংস্থা ডাব্লিউএএম নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে, সৌদি সংবাদমাধ্যমগুলো জানায় যে চিঠিতে মূলত দুই প্রতিবেশী দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
পশ্চিমা এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’-কে জানান যে, কৌশলগত এই পদক্ষেপে সংযুক্ত আরব আমিরাত আর কোনো উপায় না দেখেই একদম শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনের এমন পাশ কাটানো প্রক্রিয়ায় মোটেই সন্তুষ্ট হবেন না বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
২০১৫ সালে তৎকালীন বাদশাহ আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর মসনদে বসা ৯০ বছর বয়সী বাদশাহ সালমান বর্তমানে সচরাচর বিদেশ সফর করেন না। ২০১৯ সালে তিউনিসিয়ায় অনুষ্ঠিত আরব লিগ সম্মেলনে যোগ দেওয়াটাই ছিল তার শেষ সরকারি বিদেশ সফর। বর্তমানে তার ছেলে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানই মূলত দেশটির কার্যত শাসক এবং সরকারের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেব সমস্ত নীতিনির্ধারণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব পরিচালনা করছেন। সম্প্রতি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সাথে একটি দ্বি-পাক্ষিক বৈঠকে অংশ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা শেষে তিনি দেশে ফেরেন।
অতীতে বিভিন্ন দেশ একইভাবে যুবরাজকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করলেও সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি-সমৃদ্ধ এই দুই বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশীর সম্পর্কের যে অবনতি দেখা গেছে, তার পটভূমিতে এই চিঠি এক নতুন মাত্রা যোগ করল। চলতি বছরের শুরুতে ইয়েমেনে আমিরাত সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী বাহিনীর ওপর সৌদি আরবের বিমান হামলার ঘটনার পর দুই দেশের ভেতরে সুপ্ত থাকা রাজনৈতিক ফাটলটি প্রকাশ্যে আসে। পাশাপাশি সুদানের গৃহযুদ্ধেও দুই দেশ বিপরীতমুখী দুটি পক্ষকে সমর্থন দিয়ে আসছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওয়াশিংটন সমঝোতার চেষ্টা চালালেও কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ শান্তি দূত স্টিভ উইটকফ ও ওয়াশিংটনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আমিরাত সফরের কথা থাকলেও তা শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়ে যায়।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যৌথ সামরিক অভিযানের পর সৌদি ও আমিরাত; উভয় দেশই সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুর মেলালেও তা স্থায়ী হয়নি। মধ্যস্থতার জন্য সৌদি আরব পরবর্তী সময়ে তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়লে আরব আমিরাত সেই প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করে। তা সত্ত্বেও সম্প্রতি সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মিলে একটি নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘মক্কা প্যাক্ট’ ঘোষণা করেছে, যাকে ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের গভীর সম্পর্কের বিকল্প হিসেবে তৈরি একটি নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্ক বলে মনে করা হচ্ছে। সৌদি জোট মক্কা প্যাক্টকে কোনো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপ নয় বলে দাবি করলেও আবুধাবির রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এর তীব্র সমালোচনা করছেন। মোহাম্মদ বিন জায়েদের সাবেক উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুলখালেক আবদুল্লাহ এই চুক্তির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে লেখেন যে, যে কোনো সামরিক জোট সফল হওয়ার মূল শর্ত হলো তাদের কমন বা মূল শত্রু নির্ধারণ করা, কিন্তু এই জোট কাকে তাদের মূল শত্রু মনে করছে তা এখনও অস্পষ্ট।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
