প্রিন্ট ভার্সন ঐতিহ্য হারাচ্ছে ওয়ারী ক্লাব
আসিফ ইকবাল
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো ক্লাব ওয়ারী। ১৮৯৮ সালে স্থাপিত ক্লাবটির বয়স ১২৮ বছর। দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি এখন আর্থিক সংকটের ফ্রেমে বন্দি। ধীরে ধীরে ঐতিহ্য হারিয়ে স্মৃতির খাতায় জায়গা করে নিচ্ছে ক্লাবটি। অবশ্য কিছু সংখ্যক ক্রীড়া সংগঠকের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ধুঁকতে থাকা ক্লাবটি বেঁচে থাকার লড়াই করছে। অথচ প্রতিবেশী ভারতে প্রায় একই সময় (১৮৮৯ সাল) প্রতিষ্ঠিত মোহনবাগান ক্লাব বীরদর্পে দেশটির ফুটবলে ছুটছে। বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, ভলিবল ও টেবিল টেনিসের এক সময়কার পরিচিত মুখ ওয়ারী ক্লাব এখন আর্থিক সংকট নিয়েই কোনোরকমে টিকে আছে। আর্থিক সমস্যাকেই মূল সংকট বলেন ক্লাবটির সাধারণ সম্পাদক নাজিরুল ইসলাম নাজু, ‘ক্লাব চালাতে হিমশিম খেতে হয়। তারপরও আমরা অনেক কষ্টে চালাচ্ছি। ক্লাব চালাতে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে অর্থ। বছরে প্রায় কোটি টাকার মতো খরচ হয় খেলা, ক্যাম্পসহ অফিস চালাতে। এ অর্থের জন্য আমরা পুরোপুরি নির্ভরশীল ক্লাবের সদস্যদের চাঁদা ও ডোনেশনের ওপর।’ আজীবন সদস্যদের চাঁদা ১ লাখ টাকা। ক্লাবের আজীবন সদস্য সংখ্যা ১৪৫ জন। ক্লাবটির সভাপতি পদাধিকারবলে ঢাকা জেলার ডিসি।
ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশে (তৎকালীন বাংলা) আরও অনেক ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ভিক্টোরিয়া ক্লাব ১৯০৩ সালে, রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটি ১৯৩৩ সাল, ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ১৯৩৬, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ১৯৩৭ ও আজাদ স্পোর্টিং ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব ক্লাবের চেয়েও পুরোনো ওয়ারী একসময়কার ঢাকার ফুটবলের জনপ্রিয় ক্লাব। অনেক খ্যাতিমান ফুটবলার খেলেছেন ক্লাবটিতে। আশির দশকে ঢাকার ফুটবলে জনপ্রিয় স্লোগান ছিল ‘ওয়ারী আইলো’। শক্তিশালী আবাহনীকে এক মৌসুমে দুবার হারানোর পর স্লোগানটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ওয়ারী এখন ঢাকার চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে খেলে। ক্রিকেটে পরাক্রমশালী দল ছিল। দলটির হয়ে অতুলা সামারাসেকেরা, ব্রেন্ডন কুরুপ্পু, গামাগে, শ্রীমানোর মতো প্রতিষ্ঠিত শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটাররা খেলেছেন। অথচ ক্লাবটি ১০ বছর ধরে ক্রিকেট খেলছে না। এবার বাছাইপর্ব খেলতে নাম নিবন্ধন করেছে। ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আমরা ১০ বছর ধরে ক্রিকেট লিগ খেলছি না। এবার বাছাইপর্ব খেলার জন্য নাম নিবন্ধন করেছি।’ ক্লাবটি হকিতে খেলছে প্রথম বিভাগে এবং টিটি ও ভলিবলে প্রিমিয়ার বিভাগে।
ক্লাবটির পুরোনো নাম ব্রিটিশ আঙ্গিকে-‘ওয়েলিংটন ক্লাব’। ব্রিটিশ আমলে ১৮৩৫ সালে ফরিদপুরের ভাদুড়ী পরিবারের অন্যতম কৃতীসন্তান রামদাস ভাদুড়ী ওয়ারী এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন ওয়েলিংটন ক্লাব। দীর্ঘদিন চলার পর একসময় বন্ধ হয়ে যায় ক্লাবটি। অনেক বছর পর ওয়ারীর কয়েকজন ক্রীড়া সংগঠক ওয়েলিংটনকেই ‘ওয়ারী স্পোর্টিং ক্লাব’ নাম দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন। ওয়ারীর সে সময়কার জমিদার সুরেন্দ্রনাথ রায় ক্লাবটির গোড়াপত্তনে মূল ভূমিকা রাখেন। ক্লাবটির স্লোগান ছিল ‘ওয়ান হার্ট ওয়ান মাইন্ড’ বা এক হৃদয় এক মন’। ক্লাবটি প্রতিষ্ঠার পর বাংলার ফুটবলের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে। ক্লাবটির প্রথম সাফল্য ১৯১০ সালে। সে বছর ব্রিটিশ রাজকীয় প্রাসাদ দলকে হারায়। ১৯১৭ সালে তৎকালীণ ফুটবল লিগ চ্যাম্পিয়ন লিংকলিন ক্লাবকে হারিয়ে হইচই ফেলে দেয় ওয়ারী ক্লাব। ১৯১৯ সালে ক্লাবটি ২-১ গোলে হারায় মোহনবাগানকে। ক্লাবটির ফুটবল ইতিহাসে সেরা সাফল্য এটি। ১৯২৫ সালে ১-২ গোলে হেরে যায় ইংলিশ ক্লাব শেরউডের কাছে। ১৯৩৭ সালে ঢাকা একাদশ হারায় শক্তিশালী কোরিনিথিয়ান ক্লাবকে। ঢাকা একাদশের ১০ ফুটবলারই ছিলেন ওয়ারী ক্লাবের। হকিতে ১৯৫৩ সালে কলকাতার মাটিতে মোহানবাগানকে হারায় ৩-১ গোলে।
বাংলাদেশের অন্যতম পুরোনো দলটির ইতিহাস ধরে রাখাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
