কুড়িগ্রামে তিন মাস ধরে বন্ধ হরিজন শিশুদের পাঠকেন্দ্র

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: ৩১.০৮.২০২৬
কুড়িগ্রামে দীর্ঘ প্রায় তিন মাস ধরে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে হরিজন সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য করা একটি পাঠকেন্দ্র। এতে পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠী শিক্ষার মত একটি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সরজমিনে জানা গেছে কুড়িগ্রামের হরিজন পল্লীতে প্রায় ৪০০টি পরিবারের বসবাস। সেখানে কোন সরকারিভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকলেও শিশুদের পাঠদানের জন্য ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে একটি পাঠকেন্দ্র। সেখানে বর্তমানে ৩৬ টি শিশু পড়াশোনা করছে। অত্র এলাকায় খাস জমিতে কেয়ার বাংলাদেশ কর্তৃক নির্মিত কমিউনিটি রিসোর্স সেন্টারের একটি কক্ষকে পাঠকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছিল। সরকারি খাস জমিতে থাকা এই পাঠকেন্দ্রটির ভাড়া দাবি করাকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন মাস ধরে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে।
হরিজন সম্প্রদায়ের সবুজ রায়ের ছেলে শিশু শ্রেণীর শিক্ষার্থী রাম রায় প্রতিবেদককে দেখে বলে ওঠেন, স্যার আমাদের স্কুল কবে খুলবে? আমাদের স্কুলটা তাড়াতাড়ি খুলে দেন।
অভিভাবক শ্রীমতি জোসনা রানী বলেন, আমরা অনেক গরিব মানুষ। দৈনিক কর্মের উপর আমাদের সংসার চলে। টাকার অভাবে আমরা সন্তানকে বাইরে কোথাও পড়াতে পারিনা। এখানে স্কুলে আমাদের সন্তানকে বিনা পয়সায় পড়াতে পারতাম। হঠাৎ করে তিন মাস থেকে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে স্কুলটি। এতে আমাদের সন্তানদের পড়ালেখার চরম ক্ষতি হচ্ছে।
হরিজন শিশুদের জন্য গড়ে ওঠা নিরন্তর ভালোবাসা নামক পাঠদান কেন্দ্রের পরিচালক শুভ্রজ্যোতি সেন শর্মা বলেন, ২০২৪ সাল থেকে আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেখানে হরিজন শিশুদের নিয়ে অনিয়মিত পাঠদান চলে আসছিল। প্রতিমাসে শিক্ষকের বেতন তিনি নিজ উদ্যোগে দিয়ে থাকেন। সেখানে পাঠদান করার জন্য কারো সাথে ভাড়া বা কোন কিছুর আলাপ হয়নি। কিন্তু হঠাৎ ২০২৬ সালে মে মাসের শেষ দিকে জেলা শ্রমিক শক্তির আহ্বায়ক মজনু মিয়া অতীতের ২৬ মাসের জন্য ২৬ হাজার টাকা দাবি করেন এবং প্রত্যেক মাসের জন্য এক হাজার করে টাকা দাবি করে বসেন। এতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। প্রতি দুইবার আমি স্কুলটি খোলার জন্য গিয়ে তাদের বাধার মুখে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছি।
হরিজন সম্প্রদায়ের সাধারণ সম্পাদক শ্রী মতিলাল বাশফোর বলেন, হরিজন সম্প্রদায় হল একটি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। এই জনগোষ্ঠীর সন্তানদের এগিয়ে নিতে শিক্ষার বিকল্প নেই। পাট কেন্দ্রটিতে যে সকল শিশু পড়ালেখা করে তারা অধিকাংশই গরিব পরিবারের সন্তান। বাইরে কোথাও গিয়ে টাকা খরচ করে পড়ালেখা করার সামর্থ্য তাদের নাই। আমরা চাই যত দ্রুত সম্ভব সমস্যার সমাধান করে বাচ্চাদের পাঠকেন্দ্রটি খুলে দেওয়া হোক।
হরিজন সম্প্রদায়ের সভাপতি শ্রী নন্দলাল বাশফোর বলেন, আমাদের এই হরিজন পল্লীতে প্রায় ৪ শতাধিক পরিবার রয়েছে। এখানে কোন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নাই। ব্যক্তি উদ্যোগে যে পাঠকেন্দ্রটি পরিচালিত হয়ে আসছে সেটি বন্ধের খবর আমার জানা ছিল না। যারা সমস্যা সৃষ্টি করেছেন তাদেরকেই সমাধান করতে হবে। আমি চাই হরিজন সম্প্রদায়ের সন্তানরা পাঠদান কেন্দ্রে যাক এবং পড়ালেখা করুক। যত দ্রুত সম্ভব শিশুদের পড়ালেখার পরিবেশ সৃষ্টি করা হোক। সেটা করা না হলে গোটা জেলার হরিজন সম্প্রদায়কে নিয়ে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
কেয়ার বাংলাদেশের রংপুরের আঞ্চলিক অফিসের ওয়েব সাইটে দেওয়া নম্বরে সাবেক এক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, সৌহার্দ্য ২ প্রজেক্ট ২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চলমান ছিল। কিন্তু তিনি ২০১৩ সাল পর্যন্ত সেই প্রজেক্টে কর্মরত ছিলেন। তিনি বলেন, আমাদের নিজস্ব কোন জমিতে কোন কার্যক্রম ছিল না। বিভিন্ন জায়গায় সরকারের কাছ থেকে জমি নিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হতো।‌ প্রজেক্ট শেষ হওয়ার পর সেগুলো আবার সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন অথবা পৌরসভায় হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রজেক্টের যে ঘর ছিল তা স্থানীয়দের বিনামূল্যে ব্যবহারের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। যেন সেখানে তারা বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে। সেখানে কেউ কোন প্রকার অর্থনৈতিক লেনদেন করতে পারবে না।
স্থানীয় নূর জামাল জানান, কেয়ারের প্রজেক্ট শেষ হওয়ার পর আমি সেখানে সভাপতি ছিলাম। এখানে একটা কমিটি করে স্কুল পরিচালিত হয়ে আসছিল। এই ঘর কেউ কাউকে ভাড়া দেবে এমন এখতিয়ার কারো নেই। আমি যখন সভাপতি ছিলাম তখন সুন্দর ভাবে স্কুল চলছিল। বর্তমানে মজনু ঘটক এখানে সভাপতি হিসেবে আছে। তার সাথে শুভ্রজ্যোতি সেনের ভাড়া নিয়ে আলাপ হয়েছে না কি হয়েছে সেটা আমার জানা নেই। তবে এটা সরকারি সম্পত্তি, সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য যে কেউ ব্যবহার করতে পারবে। তার জন্য কাউকে কোন প্রকার ভাড়া দিতে হবে না।
কুড়িগ্রাম পৌরসভা সূত্র জানায়, কেয়ার স্কুল মাঠের বিষয়টা যেহেতু ২০১৫ সালের। দীর্ঘদিন আগের একটা বিষয় হঠাৎ করে সামনে আসলে এটা নিয়ে কিছু বলা মুশকিল। নথি পত্র যাচাই-বাছাই করে দেখতে হবে। জমিটা মূলত গণপূর্ত অধিদপ্তরের। তবে কুড়িগ্রাম পৌরসভার পক্ষ থেকে কোথাও কোনো প্রকার জমি কাউকে লীজ দেওয়া হয় নাই। শিক্ষা, চিকিৎসার মত মৌলিক অধিকারের হস্তক্ষেপ করলে সেটা বেআইনি। স্কুল বন্ধের ব্যাপারটা আমাদের জানা ছিল না। সরকারি জায়গায় কেউ সামাজিক কর্মকান্ড করলে সেখানে বাধা প্রদানের অধিকার কারো নাই।
গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গোটা জেলা জুড়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অনেক জমি রয়েছে। কেয়ারমাঠ স্কুলের জায়গা কাউকে লিজ দেওয়া হয় নাই। কেউ যদি নিজেদের বলে দাবি করে থাকে তাহলে তাদের কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে দেখতে হবে। হরিজন সম্প্রদায়ের শিশুদের পড়ালেখা বন্ধ করে রাখাটা অমানবিক হয়েছে। শিক্ষার অধিকার সকলের আছে এটা নিশ্চিত করা দরকার।
এ ব্যাপারে জানার জন্য অভিযুক্ত মজনু মিয়ার সাথে কথা হলে তিনি সকল অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে বলেন, কেয়ার প্রোজেক্ট শেষ হওয়ার পর তারা স্থানীয়দের নিয়ে গঠিত সিআরসি স্কুল, মোক্তব এন্ড ট্রাস্ট উন্নয়ন সমিতির গঠিত হয়েছিল। তারপর আমাদের সমিতির মাধ্যমে স্থানীয়দের উদ্যোগে স্কুল পরিচালিত হয়ে আসছিল। বর্তমানে আমি এটার সভাপতি। ২০২৪ সালে সুভ্র জ্যোতি সেন শর্মা হরিজন সম্প্রদায় শিশুদের জন্য পাঠকেন্দ্র শুরু করার জন্য আসে। আমাদের সকলের অনুমতিক্রমে সেখানে তারা স্কুল পরিচালনা শুরু করে। আমি পাঠ কেন্দ্রের ব্যাপারে কোন চাঁদা দাবি করিনি কিংবা ভাড়াও দাবি করিনি। আমার এখানে দীর্ঘ ২৯ মাস ধরে শুভ্র জ্যোতি সেন শর্মা বাচ্চাদের পড়ালেখা করিয়েছে। আমার এখানে স্কুল পরিচালনা করতে বিদ্যুৎ বিল এবং ঘরের আনুষঙ্গিক মেরামত সহ অন্যান্য অনেক খরচ আছে। প্রথম তিন মাসের ৩ হাজার টাকা দিয়েছে সেটা রশিদ আছে। পরে ২৬ মাসে কোন টাকা পয়সা দেয় নাই। সেই কারণে আমি অতীতের ২৬ হাজার টাকা চেয়েছি। আমি টাকা চাওয়ার পর থেকে তাদের ঘরে তারা তালা ঝুলিয়েছে। এবং প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রেখেছে। আমি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করিনি। কিন্তু বাস্তবে সেখানে গিয়ে ওই স্কুলের কোন বৈদ্যুতিক মিটার পাওয়া যায়নি। পাশের বাড়ি থেকে অবৈধ লাইন নিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হতো।
পাঠদান কেন্দ্র বন্ধের ব্যাপারে জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক ও জাতীয় জনজাতি জোটের আহ্বায়ক ভিমপাল্লী ডেভিড রাজুর কাছে মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, হরিজন সম্প্রদায় ব্রিটিশ শাসনামল থেকে চলে আসছে। হরিজন সম্প্রদায়ের ইতিহাস ২০০ বছরের ইতিহাস। তাদের কোন নিজস্ব জায়গা জমি নেই। সরকারি জমিতেই তারা বসবাস করে। তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। স্কুল বন্ধের বিষয়টা খুবই দুঃখজনক। আমরা চেষ্টা করব স্কুল বন্ধের পিছনে দায়ী ব্যক্তি যে দলের হোক না কেন যে গোষ্ঠীর হোক না কেন তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights