সরদহ-ঈশ্বরদী রেলপথ এখন ‘মৃত্যুর করিডর’
রাজশাহীর সরদহ স্টেশন থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত প্রায় ৪৩ কিলোমিটার রেললাইন। এ রেলপথ এখন শুধু যাতায়াতের পথ নয়, যেন নীরব মৃত্যুকূপ। একের পর এক লাশ মিলছে রেললাইনে, অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হচ্ছে না ময়নাতদন্ত। ফলে দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড-সেই প্রশ্নের উত্তর চাপা পড়ছে ‘অপমৃত্যু’ মামলার ফাইলে। এ রেলপথ এখন শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, স্থানীয়দের কাছে এটি পরিণত হয়েছে ‘মৃত্যুর করিডরে’।
প্রতিদিন এ লাইনে বনলতা, সিল্কসিটি, ধূমকেতুসহ অন্তত ১৫টি ট্রেন ৩০ বার যাতায়াত করে। এর সঙ্গে আছে লোকাল ও মালবাহী ট্রেন। ব্যস্ত এ রুটে প্রায়ই মিলছে লাশ। ঈশ্বরদী রেলওয়ে থানার তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে এ লাইনে ২৬টি লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৯-এ। চলতি বছরের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৩৩ লাশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিকাংশ ঘটনায় থানায় শুধু অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা হয়। পরিবারের আবেদনের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ হস্তান্তর করা হয়। এতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অন্ধকারেই থেকে যায়।
২১ এপ্রিল গভীর রাতে চারঘাটের কালাবিপাড়ায় উদ্ধার হয় সোহাগ আলী (২৬) নামে এক যুবকের লাশ। তাঁর দুই পা বিচ্ছিন্ন ছিল। সোহাগের বাবা জালাল উদ্দিন বলেন, ‘আমার ছেলে কিছু মাদকসেবীর সঙ্গে চলাফেরা করত। আমাদের সন্দেহ তাকে হত্যা করে রেললাইনে ফেলে রাখা হয়েছে। কিন্তু ঝামেলা বাড়বে ভেবে মামলা করিনি, ময়নাতদন্তও হয়নি।’
একই ধরনের ঘটনা ঘটে গত বছর আড়ানী রেলস্টেশনের পশ্চিম পাশে। সেখান থেকে উদ্ধার হয় মাহফুজুর রহমান মিশনের (২৫) লাশ। তাঁর মা মুল্লিকা বেওয়া বলেন, ‘রাতে ফোন করে বলেছিল কে বা কারা তাকে চোখ-মুখ বেঁধে রেখেছে। আমাকে বাঁচাতে বলেই ফোন কেটে যায়।’ পরে রেললাইন থেকে তার লাশ উদ্ধার হয়েছে। অথচ সেই ঘটনায়ও হত্যা মামলা হয়নি।
সরদহ স্টেশন থেকে আড়ানী পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলছেন স্থানীয়রা। হলিদাগাছী এলাকার মখলেসুর রহমান বলেন, ‘অনেক স্থানে অবৈধ রাস্তা তৈরি হয়েছে, কিন্তু রেলগেট নেই। ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।’ ঈশ্বরদী রেলওয়ে থানার ওসি জিয়াউর রহমান বলেন, ‘পরিবারের আবেদনের কারণে অনেক সময় ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে রেললাইনে অপরাধ দমনে আমরা কাজ করছি।’
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
